আন্ধাধুন: বলিউডের অন্যতম সেরা সাসপেন্স থ্রিলার

ক্লিভেজ ও নাভিসর্বস্ব অশ্লীল আইটেম গান, ক্লিশে প্রেম-কাহিনী আর অবাস্তব সব অ্যাকশন দৃশ্য যখন বলিউড সিনেমার প্রতিশব্দ হয়ে উঠছে তখন আন্ধাধুন এর মতো গল্প নির্ভর হার্ডকোর সাসপেন্স থ্রিলার যেন মরুভূমির বুকে এক পশলা বৃষ্টির মতো। শ্রীরাম রাঘবন পরিচালিত সিনেমাটি এবছর অক্টোবরের ৫ তারিখে মুক্তি পায়। দর্শকদের ভালবাসা নিয়ে বক্স-অফিসে সফলতা অর্জনের পাশাপাশি অঢেল প্রশংসা কুড়ায় সমালোচকদের কাছ থেকেও।

আন্ধাধুন সিনেমার একটি পোস্টার; source: m.media-amazon.com

 

কাহিনী

১৪ বছর বয়সে ক্রিকেট বল এসে মাথায় আঘাত করায় দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিল আকাশ (আয়ুশমান খুরানা)। চোখে না দেখলেও সঙ্গীতের প্রতি তার ভালবাসার কমতি নেই। সে পিয়ানো বাজায় এবং বেশ দক্ষতার সাথে বাজায়। যদিও সে আসলেই অন্ধ কিনা এ-ব্যাপারে পাশের বাসার এক অল্প বয়সী ছেলে সবসময় সন্দেহ পোষণ করে থাকে।

হাতে স্টিক নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিল আকাশ। তখন দূর্ঘটনাবশতঃ একটি স্কুটি এসে তাকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয়। স্কুটির ড্রাইভার সোফি (রাধিকা আপ্তে) দ্রুত আকাশকে টেনে তোলে এবং ‘স্যরি’ বলে। একজন অন্ধ ব্যক্তিকে স্কুটি দিয়ে ধাক্কা দেয়ার অনুশোচনা থেকে সোফি আকাশকে কিছু খাওয়ানোর জন্য একটি রেস্টুরেন্টে বসায়। রেস্টুরেন্টটির মালিক সোফির বাবা। বেশ উন্নতমানের রেস্টুরেন্ট। সমাজের উঁচুস্তরের মানুষদের যাওয়া-আসা আছে, খেতে খেতে লাইভ গান-বাজনা শোনার ব্যবস্থাও আছে।

একটি দৃশ্যে রাধিকা আপ্তে ও আয়ুশমান খুরানা; source: m.media-amazon.com

আকাশের সাথে সোফি পরিচিত হওয়ার একপর্যায়ে জানতে পারে, আকাশ পিয়ানো বাজাতে জানে। রেস্টুরেন্টে থাকা পিয়ানোতে সুরের মূর্ছনা তোলে আকাশ। আকাশের সঙ্গীত দক্ষতায় সোফির বাবা মুগ্ধ হন। সন্ধ্যায় রেস্টুরেন্টে অনেক লোক সমাগম হবে, তাই তখন এসে পিয়ানো বাজানোর জন্য আকাশকে অফার দেন। আকাশ অফার গ্রহণ করে।

সেই সন্ধ্যায় আকাশের সঙ্গীত প্রতিভা দৃষ্টি কাড়ে সাবেক ফিল্মস্টার প্রমোদ সিনহা’র (অনীল ধাওয়ান)। তিনি নিজের বিবাহ বার্ষিকী উপলক্ষ্যে আকাশকে বাসায় নিমন্ত্রণ করেন। স্ত্রী সিমি (তাবু)-কে তিনি সারপ্রাইজ দিতে চান। তাদের বিবাহ বার্ষিকীতে আকাশকে পিয়ানো বাজাতে হবে। আকাশ সানন্দে রাজি হয়।

দীর্ঘদিন পর বড় পর্দায় ফিরলেন অনীল ধাওয়ান; source: m.media-amazon.com

নির্ধারিত দিনে প্রমোদ সিনহা’র ফ্ল্যাটে গিয়ে হাজির হয় আকাশ। তার স্ত্রী সিমি খানিকটা দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতে দিতে আপত্তি প্রকাশ করে আকাশকে জানায়, তার স্বামী বাসায় নেই। আকাশ তাকে বলে, মিস্টার সিনহা আপনাকে সারপ্রাইজ দিতে চাচ্ছেন তাই হয়তো আপনাকে আমার কথা জানাননি। তিনি সম্ভবত আশেপাশেই কোথাও আছেন। আমাকে পিয়ানো বাজানোর জন্য ডেকেছেন। অগ্রীম সম্মানীও দিয়েছেন।

সিমি চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন তাবু; source: m.media-amazon.com

তারপরও প্রমোদ সিনহা’র স্ত্রী আকাশকে ভেতরে ঢুকতে দিতে নারাজ। কিন্তু বিপরীত দিকের ফ্ল্যাটের দরজা খুলে একজন বয়স্কা মহিলা উঁকি দিলে কিছুটা বিব্রতবোধ করেন সিমি। অগত্যা আকাশকে বাসার ভেতরে ঢুকতে দেন।

আকাশকে পিয়ানোতে কিছু একটা বাজিয়ে শোনাতে বলেন সিমি। আকাশ তার স্বভাবসুলভ দক্ষতার সাথে পিয়ানোতে সুর তুলে সিমিকে শোনাতে থাকে। পিয়ানো বাজানোর একপর্যায়ে ফ্ল্যাটের মেঝেতে পড়ে থাকা একটি লাশ দেখতে পায় আকাশ! কিন্তু আকাশ কীভাবে দেখতে পেল? সে তো অন্ধ!

আয়ুশমান খুরানা তার ক্যারিয়ারের সেরা অভিনয় করেছেন; source: m.media-amazon.com

কিছুটা ভড়কে গেলেও অন্ধ সাজার ভানটা চালিয়ে যায় আকাশ। কারণ সে দেখতে পায় এটা প্রকাশ হয়ে গেলে খুনের ঘটনার সাথে সেও জড়িয়ে যাবে। অন্ধ সেজে ভণ্ডামি করার ব্যাপারটাও প্রকাশ হয়ে পড়বে কিংবা অনাকাঙ্খিতভাবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে লাশ দেখে ফেলায় এই মুহূর্তে তার নিজের প্রাণটাও খোয়া যেতে পারে। ওদিকে সিমি আকাশকে অন্ধ ভেবে খানিকটা স্বস্তিতেই রয়েছেন।

কিন্তু এভাবে কতক্ষণ? লাশটা কার? সিমি’র রহস্যময় আচরণের কারণ কী? আকাশের কী হবে? কে খুন করল? তার শাস্তি হবে না? আকাশ কি এই ঘটনার সাথে জড়িয়ে যাবে নাকি নিজেকে মুক্ত রাখতে পারবে?

 

রিভিউ

২ ঘণ্টা ১৯ মিনিটের পুরোটা জুড়ে “আন্ধাধুন” দর্শককে শিহরিত করবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। কাহিনী কোনদিকে মোড় নেবে, এরপর কী হবে, কে ভাল, কে মন্দ, কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা; এসব অনুমান করতে গিয়ে রীতিমতো গলদঘর্ম হতে হবে দর্শকদের।

অন্ধ পিয়ানো বাদকের চরিত্রে দারুণ অভিনয় করেছেন আয়ুশমান খুরানা। রাধিকা আপ্তে বরাবরের মতো এবারও নিজের চরিত্রের প্রতি সুবিচার করেছেন। তবে সবাইকে ছাপিয়ে যিনি নিজের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে স্পটলাইট কেড়ে নিয়েছেন তিনি তাবু। সিমি নামের রহস্যময়ী নারী চরিত্রে তিনি যেন একদম কাঁপিয়ে দিয়েছেন!

সিনেমার অারেকটি পোস্টার; source: m.media-amazon.com

তবে ‘আন্ধাধুন’ চলচ্চিত্রের আসল খেলাটা মূলত দেখিয়েছেন চিত্রনাট্যকারগণ: শ্রীরাম রাঘবন, অরিজিৎ বিশ্বাস, পূজা লাধা শ্রুতি ও হেমনাথ রাও। এই চারজন যে কাহিনী ও চিত্রনাট্য লিখেছেন তা এককথায় দুর্দান্ত! এতটাই দুর্দান্ত যে, সিনেমা দেখতে দেখতে নিজের অজান্তেই আপনি হয়তো হাততালি দিয়ে উঠবেন বা বিস্ময়ে আপনার মুখ হাঁ হয়ে যাবে কিংবা বড় বড় হয়ে যাবে চোখ দুটো।

‘এজেন্ট ভিনোদ’, ‘বদলাপুর’ এর পরিচালক হিসেবে শ্রীরাম রাঘবনের আগে থেকেই সুখ্যাতি ছিল। ‘আন্ধাধুন’ যেন সেই খ্যাতিকে নিয়ে গেছে এক অন্য উচ্চতায়। সিনেমাটোগ্রাফিতে ছিলেন কে. ইউ. মোহানন; দর্শক হিসেবে তার কাজের কোথাও খুঁত পাওয়া যায়নি। কাহিনী অনুযায়ী সিনেমাটোগ্রাফি যথাযথ ছিল বলে মনে হয়েছে। আসলে সিনেমার গল্পটা এতটাই চমকপ্রদ যে, দর্শক এসব কারিগরি দিক নিয়ে ভাবার অবকাশ পাবে বলে মনে হয় না।

আপনি যদি বলিউড ভক্ত নাও হয়ে থাকেন তারপরও এই সিনেমা আপনার দেখা উচিত। স্রেফ একজন সিনেমাপ্রেমী হিসেবে দেখুন। ভাললাগার নিশ্চয়তা থাকছে। স্পয়লার হয়ে যাওয়ার ভয়ে কাহিনীর চমকপ্রদ অংশগুলো কিছুই উল্লেখ করা হয়নি এখানে। সিনেমাটি দেখুন, ‘আন্ধাধুন’ এর কথা আপনার অনেকদিন মনে থাকবে।

 

বক্স অফিস

সালমান খান প্রযোজিত ‘লাভইয়েত্রি’র সাথে একই দিনে মুক্তি পেয়ে বক্স-অফিস দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছিল ‘আন্ধাধুন’। ২৭ কোটি রূপি বাজেটে নির্মিত ‘লাভইয়েত্রি’ বক্স-অফিসে কোনো পাত্তাই পায়নি। মাত্র ১৬ কোটি রূপি আয় করে ‘লাভইয়েত্রি’ ডিজাস্টার তথা ভরাডুবি হয়েছে। সাথে সমালোচকদের কটুক্তি তো ছিলই। অন্যদিকে ৩২ কোটি রূপি বাজেটে নির্মিত ‘আন্ধাধুন’ আয় করেছে প্রায় ৯৩ কোটি রূপি

 

রেটিং

আইএমডিবি: ৯.১/১০ (১১,৫৪৮ ভোট)

রটেন টমেটোস: ১০০% ফ্রেশ (৯টি রিভিউ)

 

Featured Image: browngirlmagazine.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.