দেশীয় ঐতিহ্যের প্রতিনিধি বিবিয়ানা ফ্যাশন হাউজ

প্রতিটি শো রুমেই রয়েছে রঙের ঝলমলে ভাব, যা ঢোকার সাথে সাথেই যেকোনো ক্রেতাকে মুগ্ধ করবে। সবগুলো উজ্জল রঙ দিয়ে সাজানো শোরুমগুলো একটি স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে। সেই সাথে পোশাকগুলোতও রয়েছে রুচি ও ঐতিহ্যের ছাপ। সবকিছু মিলিয়ে অন্যতম এবং অন্যরকম একটি ফ্যাশন হাউজের নাম বিবিয়ানা ফ্যাশন হাউজ। বিবিয়ানা শব্দটিতেও মিশে আছে বাঙালীয়ানা ভাব। নামটা শুনলেই যেন শেকড়ের ঘ্রাণ এসে নাকে লাগে।

বুকের ভিতরে একটি মাটির টান অনুভূত হয়। তাঁতির হাতে বোনা নারী, পুরুষ ও শিশুদের সবধরনের পোশাকের সমন্বয়ে সারা দেশজুড়ে বিবিয়ানার রয়েছে মোট ১১টি শাখা। আজকে যে বিবিয়ানা পোশাকে বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করছে তার শুরুর গল্প অধিকাংশেরই অজানা। আজ জানবো বিবিয়ানার শুরু ও হাঁটি হাঁটি পা পা করে উঠে আসার কথা।

বিবিয়ানা ফ্যাশন হাউজের লোগো; Source : Lipi Khandker’s Facebook ID

যেভাবে শুরু হলো বিবিয়ানার গল্প

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্রী লিপি খন্দকার ছোটবেলা থেকেই নিজের মনের আয়নায় উঁকি দেওয়া আলপনাগুলো ফুটিয়ে তুলতেন নিজের পোশাকে। সেই সাথে শখের বশে নিজের পোশাক কখনও কখনও নিজে তৈরীও করতেন কাপড় কেটে। বড় হয়ে চারুকলায় পড়া অবস্থায় তিনি ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে চাকরি নেন দেশের অন্যতম ফ্যাশন হাউজ আড়ং এ। তখনই মনে হয়েছিল তিনি নিজেও তো পারেন এমন একটি ফ্যাশন হাউজের স্বত্বাধিকারী হতে।

কেননা চারুকলায় পড়ার সুবাদে ছবি আঁকারর সাথে পথ চলা চলছেই। ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে অভিজ্ঞতাও রয়েছে। ভাবনাটা আরও ভালো করে জেঁকে বসে অাড়ং এর চাকরিটা ছেড়ে দেয়ার পর। লিপি খন্দকার তখন একজন অভিজ্ঞ ফ্যাশন ডিজাইনার। সেই সুবাদে এই দুনিয়ার সবকিছুই তার পরিচিত। তখনই তার মনে হয় তিনি পারবেন এই সুপরিচিত রাস্তায় স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটতে।

বিবিয়ানার শাড়ীতে সুসজ্জিত এক মডেল; Source : BIBIANA Facebook Page

তবে প্রথমেই কিন্তু ফ্যাশন হাউজ খুলে বসার ভাবনার লিপি খন্দকারের মাথায় ছিলো না। তার অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতাকে ঝালিয়ে দেখতে লিপি খন্দকার প্রথম প্রথম এগোতে চেয়েছিলেন একটু পরীক্ষামূলকভাবে। তিনি চেয়েছিলেন তার ডিজাইনে বানানো পোশাকগুলোর একটি প্রদর্শনী করতে।

এরপর না হয় ভেবে দেখা যাবে কতটা কিভাবে এগোনো যায়। কিন্তু জগতের অধিকাংশ প্রশংসার কাজই তো হয়েছে বিশদ পরিকল্পনা ব্যতীত। তেমনই বিবিয়ানার ক্ষেত্রেও যেন তাই হলো। হুট করে প্রদর্শনীর পরিবর্তে ধানমন্ডি ০৫ ‘এ প্রতিষ্ঠিত হলো বাংলাদেশের স্বনামধন্য ফ্যাশন হাউজ বিবিয়ানা।

বিবিয়ানার থ্রী পিস; Source : Bibiana Facebook Page

নাম নির্বাচন

বিবিয়ানার কতৃপক্ষ মনে মননে খাঁটি বাঙালি হওয়ায় তারা চেয়েছিলেন তাদের প্রতিষ্ঠানটি বাঙালীয়ানার প্রতিনিধিত্ব করবে এবং শিকড়ের ঘ্রাণ দেবে ক্রেতাদের। আর সেজন্য একটু সুন্দর ও মাটি ঘেঁষা নাম খুঁজছিলেন তারা। তার ফলস্বরুপ প্রতিষ্ঠানটির নাম বিবিয়ানা।

র‍্যাম্পে বিবিয়ানার পোশাকে স্বত্তাধিকারী লিপি খন্দকার ও অন্যান্য মডেল; Source: Lipi Khandker’s Facebook ID

পর্যাপ্ত মূলধন না থাকলেও সহযোগীতা ও আত্মবিশ্বাসের হাত ধরে বিবিয়ানার সাফল্য

শুরুতে যতটুকু অর্থলগ্নি করা দরকার ততটুকু অর্থ ছিল না বিবিয়ানার। তবে তার চেয়ে বেশি ছিল যা, তা হল সবার সহযোগীতা ও আত্মবিশ্বাস। লিপি খন্দকার এ সময় পাশে পেয়েছেন তার স্বামীকে ও একজন পার্টনারকে। এছাড়া বিবিয়ানার সাপ্লায়ার ও প্রোডিউসাররাও তাকে আন্তরিক সহযোগীতা করেছিলেন। সবার এই আন্তরিক ও স্বতঃস্ফূর্ত ভালবাসাময় সহযোগীতায় যেন বিবিয়ানার ভাগ্যদেবতাও সন্তুষ্ট হয়ে বর দেন বিবিয়ানাকে।

বাঙালির ঐতিহ্যের ছোঁয়া মাখা পোশাকগুলো ক্রেতাদের ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে। পোশাকে বাঙালিয়ানার গন্ধ খুজে পাওয়ায় ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়েন বিবিয়ান কালেকশনে। ফলশ্রুতিতে দৈনিক হু হু করে বাড়তে থাকে বিবিয়ানার পণ্যের বিক্রি। ফলে সাপ্লায়ারদেরও আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় বিবিয়ানার ওপর। যর ফলশ্রুতিতে জন্মের পর প্রথম হাঁটতে শিখতে গিয়ে হোঁচটও খেতে হয়নি বিবিয়ানাকে, উল্টো সাফল্যের পথ ধরে আয়েশ করে দৌড়াতে শিখে গেছে সে।

বাঙালীর উৎসবে বিবিয়ানার অায়োজন; Source : Bibiana Facebook Page

বিবিয়ানার প্রথম শাখা এবং সারা বাংলাদেশে বিস্তার লাভ

দুই বছরের মধ্যে বিবিয়ানা ক্রেতাদের মনে জায়গা করে নেয় তার পণ্য দ্বারা এবং অনুভব করে এবার তার শাখা প্রশাখা দরকার। কারণ বিবিয়ানা যেভাবে ক্রেতাদের তার পানে টানছিলো তাতে একটি শো রুম দিয়ে সারা ঢাকা শহরের ক্রেতাদের চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছিল না। যার ফলশ্রুতিতে দুই বছর পর বিবিয়ানা প্রথম শাখা খোলে। এরপর ক্রেতাদের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে প্রতি বছর একটি করে শাখা খোলে তারা। এতেই বোঝা যায় বাজার ছিল বিবিয়ানার অনুকূলে।

বিবিয়ানাও তার পোশাকের সংগ্রহ বাড়াতে থাকে। নারী পুরুষ শিশু সবার জন্য আকর্ষণীয় ও রুচিসম্মত পোশাকে নিজেকে সমৃদ্ধ করে তুলতে থাকে বিবিয়ানা। তবে বিবিয়ানার সবগুলো শাখাই যে এখনও আছে তা কিন্তু নয়। অনেক সময় অনেক শাখা বন্ধ করতে হয়েছে তাকে নিজস্ব জায়গার অভাবে, ক্রেতাদের সুবিধার কথা ভেবে এবং নিজেদের ব্যবসার খাতিরে। তবে বিভিন্ন কারণে দুয়েকটি শাখা বন্ধ হয়ে গেলেও সফলতার দুয়ার কিন্তু বন্ধ হয়ে যায়নি বিবিয়ানার।

আর সেই সাফল্যের পথ ধরে শুধু ঢাকাতেই নয়, ঢাকার বাইরেও শুরু হয় বিবিয়ানার পথচলা। সিলেট, চট্টগ্রাম, বগুড়া, নারয়ণগঞ্জ সহ আজ সারা বাংলাদেশে বিবিয়ানার রয়েছে মোট ১১টি শাখা। প্রত্যেকটি শাখাতেই রয়েছে অন্যান্য ফ্যাশন হাউজ থেকে স্বতন্ত্র, তাঁতির হাতে বোনা, শিকড়ের ছোঁয়া মাখা আকর্ষণীয় পোশাক।

বিবিয়ানার শোরুমে মিডিয়া ব্যাক্তিত্ব শম্পা রেজা; Source : Bibiana Facebook Page

বিবিয়ানার বৈশিষ্ট্য এবং পণ্য সামগ্রী

বিবিয়ানার বুনন প্রক্রিয়াও আলাদা। তাঁতির হাতে বোনা হয় বিবিয়ানার কাপড়। শাড়ী, সালোয়ার, কামিজ, কুর্তি, ওড়না, বটম ওয়্যার, ছেলেেদের শার্ট পাঞ্জাবি সহ সবই আছে বিবিয়ানায়। বাঙালির বিভিন্ন উৎসবকে আরও উৎসব মুখর করতে বিবিয়ানা নিয়ে আসে বিভিন্ন পোশাক যেখানে ফুটে উঠে বাঙালিয়ানার ছোঁয়া, যেখানে পাওয়া যায় শেকড়ের ঘ্রাণ। তবে এখন শুধু পোশাকেই সীমাবদ্ধ নেই বিবিয়ানা। সাথে আছে সাধ্যের মধ্যে পোশাকের পরিপূর্ণতা আনতে রুচিশীল ডিজাইনের গয়নাও।

বিবিয়ানার অন্যান্য সামগ্রী; Source : Bibiana Facebook Page

পরিশেষে বলা যায়, বিবিয়ানার প্রচেষ্টা সাধ্যের মধ্যে উন্নতমানের ও রুচিশীল পোশাক পরিবেশন। শুরু থেকেই এই লক্ষে কাজ করে চলছে তারা। আজও তা অক্ষুন্ন রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.