বিয়ের দিনে কনের সাজে আনুষঙ্গিকতা

‘বিয়ে’ একজন নারীর জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। বিয়ে নিয়ে সব নারীর মধ্যেই অনেক কল্পনা থাকে, স্বপ্ন থাকে, পছন্দের মানুষকে নিয়ে হাজারো পরিকল্পনা থাকে। এসব কিছুর মধ্যেই যে বিষয়টি লুকানো থাকে তা হলো বিয়ের দিনে নিজেকে কেমন লাগবে এই নিয়ে চিন্তা।

বিয়েতে বর-কনে দু’জনই স্টেজে বসে থাকলেও বেশির ভাগ মানুষেরই নজর থাকে কনের ওপরে। ব্যাপারটা যে সবসময়ই সমালোচনামূলক তা নয়, কিন্তু বলা হয় একজন নারীকে বিয়ের সাজেই সবচেয়ে বেশি সুন্দর দেখায়। তাই এই দিনে একজন নারীও মনে মনে চান যেন তাকে সবচেয়ে সুন্দর দেখায়। আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় হলো বিয়ের সাজে ১০টি আনুষঙ্গিকতা, যা আপনার এই বিশেষ দিনকে আরও ‘বিশেষ’ করে তুলবে।

১. জুতা

আমরা সাধারণত জুতা কেনার ব্যাপারে খুব উদাসীন থাকি। প্রথম কথা যেটা মনে আসে সেটি হলো “পায়ের দিকে আর কে তাকাতে যাচ্ছে!” কিন্তু এটা আসলে ভুল ধারণা। এক জোড়া জুতা দিয়েই একজন মানুষের ক্লাস বোঝা যায়। তার রুচির অনেকটা ছাপ থেকে যায় জুতাজোড়ায়। তাই বিয়ের দিনে বাছাই করুন সুন্দর ও ফরমাল জুতা।

বেছে নিন ফ্ল্যাট হিলের জুতা; Source: Old School Shoes

বেশি চাকচিক্য বা রঙচটা যেন না হয় বরং একরঙা জুতার উপরে একটি বা দুটি পাথর থাকলে সেটি আরও বেশি আকর্ষণীয় দেখায়। আপনার শাড়ি যদি খুব বেশি ভারী হয়ে থাকে এবং বেশির ভাগ কাজ যদি পাড়ের নিচের দিকে হয়, তাহলে জুতা যথাসম্ভব হালকা কেনার চেষ্টা করুন। এর ফলে শাড়ি সামলে নিয়ে সাবধানে হাঁটাচলা করতে পারবেন। উঁচু জুতা বা স্যান্ডেলের ক্ষেত্রে ফ্ল্যাট হিল দেখে কিনুন। পেনসিল বা সরু হিল জুতায় দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থেকে যায়।

২. পার্স বা পাউচ

পার্স বাছাই করুন ভেবে-চিন্তে। একটি আইলাইনার, একটি লিপস্টিক, আপনার ফোন এবং কিছু টিস্যু পেপার যেন রাখা যায়। বিয়ের দিনে আপনার যে এসব টুকিটাকি জিনিসের প্রয়োজন প্রায়ই হবে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

হালকা ও সুন্দর পার্স; Source: DealeXtreme

এছাড়াও পার্সে রাখতে পারেন হালকা দুল। ভারি গয়নায় হঠাৎ যদি মনে হয় একটু বিরতির প্রয়োজন, সেটুকু তো আপনার প্রাপ্য!

৩. মেকআপ

এইদিন শখ করে হলেও নিজে না সাজাই ভালো। একটুখানি ভুলে আপনার পুরো সাজটাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। হয়তো কোনোদিনই আপনার কাজলের লাইন বাঁকা হয় না, কে জানে যদি ওইদিনই হয়ে যায়, তাই ঝুঁকি নেবার দরকার কী!

বিয়েতে আপনার জ্যোতিতে আলোকিত হোক সারা বাড়ি; Source: ShaadiWish

বরং ওইদিন আপনি চাপ মুক্ত থাকুন। কয়েকদিন আগে থেকেই রূপচর্চা শুরু করতে পারেন। নতুন কিছু ত্বকে মানিয়ে না নিয়ে বরং আগের ব্যবহৃত উপাদান দিয়েই রূপচর্চা করুন। বিউটিশিয়ানকে আগেই বলে রাখুন কেমন সাজ আপনি চাইছেন। পোশাকের রঙের সাথে মিলিয়ে অথবা কনট্রাস্ট করে সাজ ফুটিয়ে তুলতে দিন তাকেই। সম্ভব হলে সপ্তাহখানেক আগেই একবার ট্রায়াল সাজ দিয়ে ফেলুন। যদি কোথাও কম বা বেশি মনে হয় সেটা ঠিক করে নেবার সময় পেয়ে যাবেন।

৪. নেইল পলিশ ও নখের যত্ন

আজকের দিনে ফ্রেঞ্চ মেনিকিউরের মতো হালকা সাজের দরকার নেই। আজ আপনার নখও সাজুক ইচ্ছামতো। মেহেদি, চুড়ি ও পরনের পোশাকের সাথে যায় এমন রং বেছে নিন। নেইল পলিশ দেবার আগে অবশ্যই একবার মেনিকিউর করে নিন। নখের কোণা ওঠা, কিউটিকলের আকৃতি নষ্ট হওয়া, হাত কেটে-ছড়ে যাওয়া ইত্যাদি কোনো সমস্যা থাকলে সেটির জন্যও বিউটিশিয়ানের শরণাপন্ন হন।

শাড়ি-গয়না ভারি হলেও হাতে হালকা রঙের নেইল পলিশ; Source: UrbanClap

আপনার যে হাত দু’খানি কারও হাতে পড়বে সেও যেন আজীবন এই সুন্দর হাতের স্মৃতি ধরে রাখতে পারে। তাছাড়া বিয়েতে ক্যামেরাম্যানের শত ক্লিকের ভিড়ে আপনার হাতজোড়া যে কতটা জায়গা করে নেবে তা কি আমরা আদৌ জানি? তাই নখের ব্যাপারে যত্নশীল হন এবং সুন্দর নেইল পলিশ বাছাই করুন।

৫. টিপ

টিপ হতে পারে গোলাকার, লম্বা, বড় বিভিন্ন আকারের ও ডিজাইনের। তবে আজকের দিনে বাছাই করুন একটু গর্জিয়াস টিপ। আর যদি আপনি কপালে আর কোনো সাজ করে থাকেন তাহলে টিপের আকার তার ওপরে নির্ভর করতে পারে।

টিপ নির্ভর করে বাকি সাজের উপর; Source: Saubhaya Makeup

৬. কপালের অন্যান্য সাজ

কনে সাজানোর ক্ষেত্রে কপালের সাজের জন্য নারীদের বিভিন্ন রকম পছন্দ রয়েছে। বিভিন্ন আকার এবং ডিজাইনের টিপের পাশাপাশি অনেকেই কুমকুম দিয়ে কপাল সাজাতে পছন্দ করেন।

কুমকুমের বাহারি রঙে রাঙানো কপাল; Source: Youtube

আগেকার বিয়েতে কনে সাজানোর বাহারি উপাদানগুলোর পাশাপাশি কুমকুম খুব প্রচলিত একটি উপাদান ছিলো, যা এখনকার সময়ের বিয়েতে একটু কম দেখা যায়। কিন্তু এই চল একেবারে থেমে যায়নি। কুমকুম দিয়ে কপাল সাজানোর ক্ষেত্রে কপালের আকার, চুলের ডিজাইন, টিপের ডিজাইন ও আকার ইত্যাদি মাথায় রাখা উচিত। খেয়াল রাখতে হবে, যেন অতিরিক্ত কপাল সাজানো না হয় কিন্তু পুরো সাজের সাথে যেন খাপ খেয়ে কনেকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলে।

৭. হাত ও পায়ের সাজ

গায়ে হলুদ থেকে শুরু করে বিয়ে ও পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা পর্যন্ত হাত ও পায়ের সাজ খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মনে করেন, যে কনের হাতের মেহেদির রং বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার পরে যতোদিন থাকবে, তার সংসার ততো স্থায়ী হবে। আজকাল অনেকেই হাত ও পা ভরে মেহেদি পরতে পছন্দ করেন।

হাতে ও পায়ে মেহেদির সাজ; Source: Matrimony Blog – Byoh

অনেকেই আবার ক্লাসিক একটা লুক দেয়ার জন্য পায়ে আলতা দিতে চান। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আজকালকার মেহেদি ও আলতা আর আগের মতো প্রাকৃতিক উপাদানে ভরপুর নয় বরং রং গাঢ় ও স্থায়ী করার জন্য অনেক রাসায়নিক উপাদান দিয়ে ভরপুর। আর এধরনের সাজের কারণে তাই হাত ও পায়ের ত্বকে সংক্রমণ দেখা দিতে পারে।

আলতা রাঙা পা; Source: Pinterest

তাই বিয়ের বেশ আগেই ভালো মেহেদি ও আলতা পছন্দ করুন এবং একদম নিশ্চিন্ত থাকতে এক মাস আগেই একটু একটু করে ব্যবহার শুরু করুন যেন বিয়ের মতো স্মরণীয় একটি সময়ে আপনাকে ত্বকের জন্য দুশ্চিন্তা করতে না হয়।

৮. গয়না ও অলংকার

বিয়ে হবে আর কনের সাজে কোন অলংকার নেই এটা সম্ভব নয়। আর গয়নার জন্য ব্যক্তিগত পছন্দ, মুখ ও শরীরের আকৃতি ও গড়ন, বাজেট ইত্যাদি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সাধ ও সাধ্যের মাঝে যে সমস্ত গয়নায় কনেকে চমৎকার মানিয়ে যায় সেগুলোই তার সাজে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

কনের অলংকার; Source: FashionBoleTo

পাশাপাশি কনেকে চোকার বা গলায় আটকে থাকে এমন গয়নায় না সাজানোটাই ভালো। কারণ বেশ অনেকক্ষণ ধরে গলায় অস্বস্তি কেউই সহ্য করতে চাইবেন না। পাশাপাশি কনে যেন গয়নার আতিশায্য একদম ঢেকে না যান সেদিকেও নজর রাখা উচিত।

৯. চুলের সাজ

চুলের সাজের জন্য চুলের গয়না বা ফুল অথবা দুটোই বেছে নেয়া যেতে পারে। গয়না হিসেবে টিকলি, টায়রা, হেয়ার পিন, ঝাপটা ইত্যাদি এবং ফুলের জন্য যে কোন রঙিন ফুল বাছাই করা যেতে পারে।

টিকলি ও টায়রা; Source: WeddingZ

ভালো হয় কনে যদি অন্তত একবার চুলের সাজটা বিয়ের আগেই ঠিক করে নিতে পারেন। তা না হলে হঠাৎ করে ফুল ম্যানেজ করাটা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়াতে পারে।

১০. এক টুকরো সুন্দর হাসি

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অত্যাবশ্যকীয় সাজ! হাসি ছাড়া কনের সাজ অপূর্ণ থেকে যায়। বিয়ে মানুষের জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। একমাত্র হাসির দ্বারাই বিয়ের আসরে কনেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী, সুখী ও ভাগ্যবতী বলে মনে হয়। তাই ভূবন ভোলানো সুখের হাসি শুধু বিয়ের আসরে নয় বরং সারাজীবনে যেন নিত্যদিন থাকে তার অনুশীলনী বিয়ের আগে থেকেই শুরু করা উচিত।

ভুবনভোলানো হাসি; Source: ZoWed

এইদিনে আপনার সাজ পরিপূর্ণ, স্নিগ্ধ ও বিশুদ্ধ হোক। আপনার সকল সৌন্দর্য ঠিকরে পড়ুক সারা ঘরে। সাজের সময় অতিরিক্ত ভারি সাজ না নিয়ে বরং আপনার নিজস্বতাকে মেলে ধরুন। এটাই হওয়া উচিত সত্যিকার অর্থে একজন কনের সাজ।

 

Feature Image Source: GirlandWorld

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.