জামদানি শাড়ির বৈশিষ্ট্য, প্রাপ্তিস্থান ও দরদাম

বাঙালি নারীদের উৎসব মানেই শাড়ি পরার প্রচলন শুরু হয়ে যায়। নারী যেন শাড়িতেই অপরূপা ও সুন্দর। যেকোনো উৎসব ও অনুষ্ঠানে পরার জন্য নারীদের প্রথম পছন্দ জামদানি শাড়ি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যেকোনো বয়সের নারীরা জামদানি শাড়ি পরতে ভালবাসে। তাছাড়া শাড়ির কারুকাজ ও সৌন্দর্যের জন্য জামদানি বেশি বিখ্যাত। শুধু বর্তমানে নয়, অতিপ্রাচীনকালেও জামদানি শাড়ি বেশ বিখ্যাত ছিল। মূলত মুঘল আমলে জামদানির প্রচলন ছিল। এর অনন্য বৈশিষ্ট্য, মিহি সুতা ও দক্ষ কারিগরের দক্ষ কাজের কারণে পৃথিবীব্যাপী জামদানি শাড়ির সুখ্যাতি ছিল।

জামদানি শাড়ির বাহার; Source: famousnews24.com

জামদানি বলতে মূলত শাড়িকে বোঝানো হলেও জামদানির জামা, ওড়না, কুর্তি ইত্যাদিও রয়েছে। জামদানি শব্দটি মূলত ফার্সি শব্দ থেকে এসেছে। ফার্সি জামা অর্থ কাপড় এবং দানা অর্থ বুটি । সে অর্থে জামদানির অর্থ দাঁড়ায় বুটিদার কাপড়। মনে করা হয় ভারত উপমহাদেশে সর্বপ্রথম মুসলমানেরা জামদানি শাড়ির প্রচলন ও বিস্তার শুরু করেন। আরেকটি মতে ধারণা করা হয় জাম পরিবেশনকারী ইরানি সাকির পরনের মসলিন কাপড় থেকে জামদানি কাপড়ের নামের উৎপত্তি হয়েছে।

হাফসিল্ক জামদানি; Source: Bangla Tribune

ইতিহাস থেকে জানা যায় ঢাকার গোড়াপোত্তনের আগেই নারায়নগঞ্জে জামদানি শাড়ির প্রচলন শুরু হয়। প্রাচীনকালে মসলিন শাড়ির উত্তরাধীকারী হিসেবে জামদানি শাড়ি নারীদের কাছে অতিপরিচিত ছিল। ইতিহাস থেকে জানা যায় ঢাকাই জামদানি রাজধানী ঢাকার ইতিহাস থেকেও পুরনো। ১৬১০ সালে যখন সুবেদার ইসলাম খান তার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন এবং তখন থেকেই ঢাকার উৎপত্তি। অথচ জামদানির উৎপত্তি আরো অনেক আগে থেকে।

জামদানি শাড়ির বৈশিষ্ট্য

  • মসলিন শাড়ি ও জামদানি শাড়ির মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। জামদানি ও মসলিন শাড়ি একই প্রজাতির। মসলিন থেকে জামদানির অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর পাড় বুননে ব্যবহার করা হয় অসংখ্য সুতা ও মোটা বুনন যা দেখতে চমৎকার।
  • জামদানি শাড়ির রয়েছে বৈশিষ্ট্যমূলক জ্যামেতিক প্যাটার্নের ধারাবাহিকতা যা ইরানি প্রভাবে প্রভাবিত এবং এর মোটিফ অর্থাৎ এটি বুননের সময় কাপড়ে খুব সুন্দরভাবে বসে যায়।
  • জামদানি শাড়ি বুনন, নকশা ও ঐতিহ্যের কারণে বিখ্যাত। জামদানি শাড়ির পাড়গুলোও বেশ কারুকার্যখচিত। জামদানি শাড়ির জমিনের নকশা মূলত তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত। যেমন বুটা, জাল ও তেছড়ি। শাড়িতে ব্যবহৃত জনপ্রিয় অনুষঙ্গগুলো হলো শাপলা, ফড়ং ফুল, শঙ্খমতি, সিঙ্গাড়া ও বেলপাতা।জামদানি শাড়ির পাড়েও রয়েছে ভিন্নতা যেমন করলা পাড়, কলকা পাড় ইত্যাদি।
  • পূর্বে তাঁতিরা স্মৃতি থেকেই জামদানি শাড়ির কারুকাজ আঁকতেন। বর্তমানে কাগজে নকশা এঁকে পরে শাড়িতে রূপদান করা হয়।
  • নকশা অনুযায়ী বিভিন্ন জামদানি বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন কলমিলতা, ময়ূর প্যাচ, কচুপাতা, পুঁইলতা, তেরছা, জালার, ডুরিয়া, শাপলাফুল, জুঁইবুটি, বাঘনলি, ঝুমকা, চন্দ্রহার, হংস, প্রজাপতি পাড়, চালতা পাড়, পান্না হাজার, দুবলি জাল, বুটিজাল, ইঞ্চি পাড়, বিলাই আড়াকুল নকশা, বেলপাতা পাড়, জবাফুল, শামুকবুটি, কচি পাড়, চন্দ্রপাড়, কলস ফুল ইত্যাদি। বর্তমানে শাড়ির জমিনে পদ্দমফুল গোলাপফুল, জুঁইফুল, সাবুদানা, আদারফানা, কলারফানা ইত্যাদি নকশা আঁকা হয়।
  • তেরছা জামদানিতে ছোট ছোট ফুলগুলো তেরছাভাবে আঁকা হয়, জালার নকশার জামদানিতে ফুল, লতাপাতার বুটিজাল বুননের মতো সমস্ত জমিনে কাজ থাকে, ডুরিয়া জামদানিতে থাকে ডোরাকাটা নকশা। ফুলওয়ার জামদানি শাড়িতে থাকে অনেক ফুলের নকশা।  

জামদানি শাড়ির প্রকারভেদ

জামদানি শাড়ি দুই ধরনের হয়। হাফসিল্ক জামদানি ও ফুল কটন জামদানি। হাফসিল্ক জামদানিতে আড়াআড়ি সুতাগুলো হয় রেশমের এবং লম্বালম্বি সুতাগুলো হয় সুতার।

জামদানি শাড়ির কারুকাজ; Source: krishtikatha.com

ফুল কটন জামদানি শাড়ি পুরোপুরি তুলোর তৈরি সুতার হয়। হাফসিল্ক এবং ফুল কটন প্রতিটি জামদানি শাড়ি দেখতে চমৎকার এবং কারুকাজ অসাধারণ।  

ব্যবহার ও যত্ন

জামদানি শাড়ি শুধু পরে রেখে দিলেই হবে না, চাই বিশেষ যত্ন। জামদানি শাড়ি পরার পর ভালোভাবে বাতাসে শুকিয়ে আলমারিতে তুলে রাখতে হবে। তবে কিছুদিন পর পর শাড়ি বের করে বাতাসে শুকাতে হবে কিংবা আপনি চাইলে রোদে শুকাতে পারেন। নয়তো শাড়ি্তে সাদা সাদা ছোপ পড়বে এবং কিছুদিনের মধ্যে ফেসে যাবে।

লাল রঙের জামদানি; Source: newsg24

তাই জামদানি শাড়ি অনেক দিন ভাজ করে কিংবা হ্যাঙারে ঝুলিয়ে না রাখাই ভালো। অন্যান্য শাড়ির মতো জামদানি শাড়ি বাসায় ধোলাই করবেন না। কেননা বাসায় শাড়ি ধুলে তা অতি দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। শাড়ি অনেক দিন ব্যবহার করার জন্য ড্রাইওয়াশ করা ভালো। আর কিছু দিন অর্থাৎ এক দুই মাস পর পর শাড়ি রোদে দিলে ফাঙাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

কারুকার্যখচিত নীল রঙের জামদানি; Source: alibaba.com

অনেকে জামদানি শাড়ির নিচের দিকে ফলস লাগায় যেন দ্রুত শাড়ি নষ্ট না হয় এবং হাঁটার সময় শাড়ি উড়ে না যায়। আপনিও চাইলে পাড়ে ফলস লাগিয়ে নিতে পারেন। এতে করে ব্যবহারের সময় ময়লা লেগে শাড়ি নষ্ট হবে না। শাড়ির কোথাও যদি দাগ লাগে তাহলে পানি দিয়ে কিংবা হাত দিয়ে না ঘষে ট্যালকম পাউডার ছিটিয়ে দিয়ে পরে তা ড্রাই ওয়াশ করাতে হবে।

জামদানির প্রাপ্তিস্থান

জামদানি শাড়ি এখন অনেক জনপ্রিয়। প্রায় প্রতিটি মার্কেট, ফ্যাশন হাউজে জামদানি শাড়ি পাওয়া যায়। আড়ং, ড্রেসিডেল, রঙ, টাঙ্গাইল শাড়ি কুটির, জয়ীতা ইত্যাদি সব জায়গায় জামদানি শাড়ি পাওয়া যায়। এছাড়াও বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্স, নিউমার্কেট, হকার্স মার্কেট ইত্যাদিতে ভালো জামদানি শাড়ি পাবেন। বর্তমানে অনেক অনলাইন পেইজে জামদানি শাড়ি পাওয়া যায়।

রুপগঞ্জ ও সোনারগাঁও এর জামদানি পল্লীতে যেতে পারলে আপনি অনেক ভালো মানের জামদানি কিনতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে আপনাকে দাম সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখতে হবে।

দরদাম

জামদানি শাড়ি ১৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৪০০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। দাম নির্ভর করে শাড়ির বৈশিষ্ট্য ও কারুকাজের উপর।

Featured Image Source: শাড়ি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.