নারীর প্রিয় কাতান শাড়ির দরদাম ও যত্ন

শাড়ি যেন বাঙালী নারীর নিত্যদিনের সঙ্গী। শাড়িতে প্রকাশ পায় নারীর আভিজাত্য, গাম্ভীর্য, রূপ, রঙ ও ঢঙ। কেননা শাড়ি নারীর জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একজন বাঙালী নারীকে শাড়িতে যতোটা আধুনিক, রুচিশীল ও সুন্দর লাগে অন্য কোনো পোশাকে ততোটা সুন্দর লাগে না।

বাঙালী নারীরা অনেক ধরনের শাড়ি পরে থাকে। জামদানি, সিল্ক, কাতান, টাঙ্গাইল, সুতি, তাঁত, মণিপুরি ইত্যাদি শাড়িগুলো নারীর পছন্দের তালিকায় থাকে। এছাড়াও বাটিকের শাড়ি, চুমকি শাড়ি, ব্লকের শাড়ি পছন্দ করে তারা। তবে বিয়ে, দাওয়াত কিংবা যেকোনো পার্টির জন্য নারীরা বেছে নেয় কাতান শাড়িকে।

কাতান শাড়িতে নারী; Source:Prothom Alo

কেননা কাতান শাড়িতে রূপের মাধুর্য্য যেভাবে প্রকাশ পায় সেভাবেই প্রকাশ পায় ব্যক্তিত্ববোধ। বিয়ে, বৌভাত ছাড়াও যেকোনো অনুষ্ঠানে নারীরা কাতান শাড়ি পরে থাকে।

ইন্ডিয়ান পিউর কাতান শাড়ি; Source: YouTube

কাতান শাড়ির বিভিন্ন ধরন রয়েছে। যেমন কাঞ্জিভারাম কাতান, সিল্ক কাতান, পশমিনা কাতান, ইন্ডিয়ান কাতান, আপেরা কাতান, মিরপুর কাতান, সাউথ কাতান, বেনারসি কাতান, নেট কাতান ইত্যাদি। একেক ধরনের কাতানের একেক রকম দরদাম। প্রতিটি শাড়ি তাদের নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে অপরুপা। প্রতিটি শাড়ির বুনন, মান, নকশা সবকিছু অনন্য।

কাতান শাড়ির ইতিহাস

বেনারসি কাতান শাড়ির উৎপত্তি হয় ভারতের বেনারস শহরে। মোঘল আমলে এই শাড়ির বিস্তৃতি ঘটে। চতুর্দশ শতকে ভারতে শাড়ির উৎপত্তি হলেও এই শাড়ি এখন আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয়। ভারতের বেনারস ছাড়া আর অন্য কোথাও এই শাড়ি তৈরি করা হয় না। এখন মানুষ বেড়াতে গেলেই কাতান শাড়ি পরার কথা ভাবে। অনুষ্ঠানে গেলেও প্রথম পছন্দের তালিকায় কাতান শাড়িকে রাখে। কারণ কাতান শাড়ি সহজে সামলানো যায়। এর ওজন হালকা। তাছাড়া এই শাড়ি দেখতে খুব সুন্দর। শাড়িতে থাকে নানা কারুকাজ। উজ্জ্বল রঙের যেকোনো শাড়ি যেকোনো বয়সের নারীকে মানিয়ে যায়।

বেনারসি শাড়ি; Source: YouTube

বাংলাদেশের তাঁতিরা বছরের পর বছর কাতান শাড়ি বুনছে আপন সৃজনশীলতা দিয়ে। ভারতেও কাতান শাড়ির প্রচলন ব্যাপক। কাতান শাড়ির বুনন, সুতা ও কারুকাজ ইত্যাদি সম্পর্কে কীভাবে জানলো বাংলাদেশের তাঁতিরা? এই সম্পর্কে জানতে হলে আরো পেছনে যেতে হবে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ভারতের বেনারস থেকে মুসলমান তাঁতিরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অর্থাৎ বর্তমানের বাংলাদেশে চলে আসে। পরবর্তীতে সরকার তাদের রিফিউজি কোয়ার্টার বানিয়ে দেয় মিরপুরে। সেখানে বসবাস করতে থাকেন মুসলমান তাঁতিরা।

বেগুনি রঙের কাতান; Source: YouTube

সেই থেকে মিরপুরের ঐ কোয়ার্টার বেনারসি পল্লী নামে পরিচিত। আগত তাঁতিরা তাদের নিজস্ব সৃজনশীলতা, নান্দনিক ডিজাইনের মাধ্যমে উন্নত রুচির পরিচয় দিচ্ছে বহু বছর ধরে। মিরপুর এগারো ও বারো নম্বরে শতাধিক বেনারসি শাড়ির দোকান রয়েছে। এসব দোকানে বিশ থেকে ত্রিশ প্রকারের বেনারসি ও কাতান শাড়ি পাওয়া যায়। গুনগত মান অনুযায়ী প্রতিটি শাড়ির দামও বেশ চড়া।

নকশা ও তৈরি পদ্ধতি

বেনারসি শাড়ির অন্যতম বৈশিষ্ট্য রেশম সুতার সোনালী জরির কারুকাজ। শাড়ির কাজ কখনো কম আবার কখনো বেশি হয়। আশির দশকে শাড়িতে ঘরবাড়ির নকশা, টেরাকোটার নকশা করা হলেও  পরবর্তীতে নকশায় ভিন্নতা আনা হয়। নব্বই দশকে বেশি চলতো সামার কাতান, সুস্মিতা কাতান, টিস্যু কাতান, সিলসিলা কাতান ও ওয়াল কালাম। তারপরের দশক থেকে তাঁতিরা শাড়িতে নিয়ে আসে অভিনবত্ব। বেনারসি ও কাতান শাড়িতে ব্যবহার করা হয় হালকা পাড়, মোটা পাড়, ভেলভেট কাপড়ের পাড়, স্ট্রাইপ করা মোটা পাড় এবং শাড়ির জমিনে সোনালি জরি সুতার কাজ।

কানিজ কাতান শাড়ি; Source: cyberspaceandtime.com

বেনারসি শাড়ি তৈরি প্রক্রিয়া বেশ জটিল। বেনারসি শাড়ি তৈরির মূল উপাদান কাঁচা রেশম সুতা। এছাড়াও জরি সুতা ব্যবহার করা হয়। তাঁতিরা অধিক মূল্যের কারণে দেশি রেশম সুতা ব্যবহার না করে চায়না থেকে আগত সিল্ক সুতা ব্যবহার করে। প্রথমে তারা সুতাগুলোকে রঙে ভেজায়। তারপর সাবান ও গরম পানি দিয়ে ধুয়ে তা রোদে শুকাতে দেয় তারা। শুকিয়ে গেলে মনের মাধুরী মিশিয়ে নিজস্ব ডিজাইনে তৈরি করে শাড়ি।

উৎসবের কাতান শাড়ি; Source: Prothom Alo

ডিজাইন ও বুনন সহজ হলে একটি শাড়ি তৈরি করতে সময় লাগে প্রায় এক সপ্তাহ। ডিজাইন যদি কঠিন হয়, বুনন যদি সুক্ষ্ম করার প্রচেষ্টা চালানো হয় তাহলে তিনজন তাঁতির একটি শাড়ি বুনতে সময় লাগে তিন মাস। শাড়ি তৈরি করে তারা ক্ষান্ত হন না। শাড়ি তৈরির পর তারা পলিশের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেন। বেনারসি শাড়ির ধরন ও ডিজাইনের উপর ভিত্তি করে নামের বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন পিরামিড কাতান, বেনারসি কসমস, চুনরি কাতান, ব্রোকেট কাতান, প্রিন্স কাতান ও মিরপুরি রেশমি কাতান।

কাতান শাড়ির প্রাপ্তিস্থান

বলার অপেক্ষা রাখেনা মিরপুরের বেনারসি পল্লীতে কাতান ও বেনারসি শাড়ি পাওয়া যায়। বেনারসি পল্লী ছাড়াও ঢাকার নিউমার্কেট, হকার্স মার্কেটে ভালো শাড়ি পাওয়া যায়।

সবুজ কাতান; Source: newsg24.com

হকার্স মার্কেটের প্রায় সব দোকানে বিভিন্ন ডিজাইনের কাতান শাড়ি রয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন শপিং কমপ্লেক্স, অনলাইন পেইজে ভালো মানের কাতান শাড়ি পাবেন।

দরদাম

কাতান শাড়ির ডিজাইন, বুনন ও মানের উপর দামের তারতম্য দেখা যায়। কাতান শাড়িগুলো ২০০০ থেকে শুরু হয়। তবে সিল্ক কাতানের দাম আরেকটু কম। হালকা কাজের কাতান, কাঞ্জিভরম কাতান শাড়িগুলো পাওয়া যাবে ১৭০০-৩০০০ টাকার মধ্যে।

নেট কাতানের শাড়িগুলো পাওয়া যাবে ৩৫০০-৪৫০০ এর মধ্যে। অন্যান্য কাতান শাড়ি গুলো ২০০০ টাকা থেকে ৮০০০, ১০,০০০ এমনকি তার বেশি দামেরও হয়ে থাকে। বেনারসি শাড়িগুলোর দাম লাখ টাকার মধ্যে বা তার উপরেও হয়ে থাকে।

শাড়ির যত্ন

শাড়ি অনেক দিন পরার জন্য যত্ন নিতে হয়। নয়তো শাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। পরার পর শাড়ি ভাঁজ করে রেখে না দিয়ে বাতাসে কিংবা রোদে শুকাতে দিতে হবে। ভালো শাড়ি বাসায় না ধুয়ে লন্ড্রিতে ড্রাই ওয়াশ করা ভালো। আলমারিতে ভাঁজ করে না রেখে হ্যাঙারে ঝুলিয়ে রাখলে শাড়িতে ভাঁজ পড়ে না।

Featured Image Source: Dinvor.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.