কিংবদন্তী চলচ্চিত্র নির্মাতা মৃণাল সেন

চলচ্চিত্র অনেকেই নির্মাণ করেন। কেউ নির্মাণ করেন বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্র, কেউ নির্মাণ করেন আর্ট ফিল্ম। একেক নির্মাতার নির্মাণে থাকে একেক রকম বিশেষত্ব। তারা নিজ প্রতিভা ও বিশেষত্বের গুণে গুণান্বিত করেন তাদের চলচ্চিত্রকে এবং তা তুলে ধরেন সমগ্র দেশের সম্মুখে, মুগ্ধ করেন হাজার হাজার দর্শকবৃন্দকে। কিন্তু কালেভাদ্রে কতিপয় নির্মাতা জন্ম নেন, যাদের মাঝে এমন কিছু প্রতিভা থাকে এবং তাদের নির্মিত চলচ্চিত্রে এমন কিছু বিশেষত্ব থাকে, যে বিশেষত্বের প্রভাবে তাদের চলচ্চিত্র অবস্থান করে নেয় বিশ্বের দরবারে। মন জয় করে নেয় কত শত দেশি বিদেশি আলোচক, সমালোচক সিনেমাবোদ্ধা ও সিনেমাপ্রেমীদের মনে।

এমনই একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা মৃণাল সেন, যিনি বিশ্ব দরবারে বাংলা চলচ্চিত্রকে পরিচিত করতে ও বিশ্বের সিনেমা বোদ্ধাদের বাংলা সিনেমা নিয়ে ভাবার মতো অবস্থা তৈরী করতে রেখেছেন অপরিসীম অবদান। তার চলচ্চিত্রে ফুটে উঠেছে বাস্তবতার পরিষ্কার ছবি, সেটাকে সিনেমাটিক আবহের সংমিশ্রণে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি নিপুণভাবে। তার সিনেমায় রয়েছে মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গী, রয়েছে পরাবাস্তব ও জার্মান অভিব্যাক্তিবাদী শিল্পদর্শনের ব্যাবহার।

মৃণাল সেন; Image Source: ZEE ২৪ ঘণ্টা

একটা সময় ছিল যখন উপমহাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা বলতে তিনজনকে নির্মাতাকে বোঝানো হত। এদের একজন এই মৃণাল সেন। বাকি দুজন হলেন সত্যজিত রায় ও ঋত্বিক ঘটক। কালোত্তীর্ণ হয়ে আজো এরা বর্তমান সময়ের নির্মাতা হতে চাওয়া স্বপ্নবাজদের পথ দেখিয়ে চলেছেন। সত্যজিত রায় ও ঋত্বিক ঘটক দুজনই গত হয়েছেন আরো আগে। বাকি ছিলেন মৃণাল সেন। পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে তিনিও সম্প্রতি পাড়ি জমিয়েছেন পড়পাড়ে। আজ এই কিংবদন্তী চলচ্চিত্র নির্মাতা সম্পর্কে জানবো।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন

মৃণাল সেনের জন্ম তৎকালীন ভারতবর্ষের পূর্ব বঙ্গে (বর্তমান বাংলাদেশ) অবস্থিত ফরিদপুরে। ১৯২৩ সালের ১৪ মে এই ব্যাক্তিত্ব জন্মগ্রহণ করেন। সবুজে বেষ্টিত ও তেরোশো নদী বয়ে চলা এই বাংলার জোৎস্না ধোয়া ও জোনাকির আদরমাখা রাত এবং রোদ-ছায়ায় আঁকা দিনের সাথে সখ্যতা করেই বেড়ে ওঠেন মৃণাল সেন। এখানেই কাটে তার শৈশব ও কৈশোর।

ফরিদপুরে বাল্যশিক্ষা, মাধ্যমিক শেষ করে ১৯৪৩ সালে রাজেন্দ্র কলেজে পড়াবস্থায় পশ্চিমবঙ্গ কলকাতায় পাড়ি জমাম মৃণাল সেন। তৎকালীন স্বপ্নের শহর কলকাতার সস্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন পদার্থবিদ্যায়। সেখান থেকে স্নাতক ও পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকত্তোর ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষাজীবনের ইতি টানেন তিনি ।

চলচ্চিত্রে পদার্পণ

কথা বলছেন হয়তো সিনেমা নিয়েই; Image Source: ZEE ২৪ ঘণ্টা

শিক্ষাজীবন শেষে মৃণাল সেন পেশাগত জীবনে কিছুদিন সাংবাদিকতা করেন। পরবর্তীতে ওষুধ কোম্পানিতে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের চাকুরি নেন। এই পেশার কারণে মৃণাল সেনকে ছাড়তে হয় কলকাতা শহর। কিন্তু যার হাত ধরে বাংলা সিনেমা সমাদৃত হবে বিশ্ব দুয়ারে, যিনি বাংলা সিনেমাকে ভেঙেচুরে ঢেলে সাজাবেন মৃণালাঙ্গিকে তাকে কি আর ঐ ছপোষা চাকুরির শিকল বেঁধে রাখতে পারে?

একদিন সব ছেড়েছুড়ে মৃণাল সেন আবার ফিরে আসেন কলকাতায়। চাকুরি নেন কলকাতার একটি ফিল্ম স্টুডিওতে অডিও টেকনিশিয়ান হিসেবে। এখান থেকেই চলচ্চিত্র পাড়ার সাথে টুকটাক করে একদিন গভীর বন্ধনে জড়িয়ে পড়েন মৃণাল। তার ধারাবাহিকতায়ই ১৯৫৫ সালে বুকে পুষে রাখা, স্নায়ুতে বহন করে চলা স্বপ্নকে বাস্তবে রুপ দেন তিনি। তৈরী করেন তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘রাতভোর’। রাতভোরে অভিনয় করেন তখনও মহানায়কের পাদপ্রদীপের আলোয় না আসা উত্তম কুমার।

সাফল্যের সাথে সখ্যতা

সেটে কলাকুশলিদের সাথে মৃণাল সেন; Image Source: NEWS 18

রাতভোর চলচ্চিত্রটি তেমন সাফল্য অর্জন করতে ব্যর্থ হলেও মৃণাল সেন দমে গেলেন না। এর কয়েক বছর পরই তিনি হাজির হলেন তার নতুন চলচ্চিত্র ‘নীল আকাশের নিচে’র হাত ধরে। এবার আর ভাগ্য দেবতা ফিরিয়ে দিল না মৃণাল সেনকে। নীল আকাশের নিচে চলচ্চিত্রটির সাফল্য তাকে এনে দিল স্থানীয় পর্যায়ে পরিচিতি ও খ্যাতি। দেশজুড়ে তিনি পরিচিত হলেন মেধাবী নির্মাতা হিসেবে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি

১৯৮২ সৃলে কান উৎসবে জুরি সদস্যদের সাথে মৃণাল সেন; Image Source: NEWS 18

‘নীল আকাশের নিচে’ দিয়ে স্থানীয় খ্যাতির চাদর গায়ে পেঁচিয়ে বিচরণ করতে থাকা মৃণাল সেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত হয়ে উঠতে খুব বেশি সময় লাগেনি। নিজ মেধা গুণে তার তৃতীয় চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে যান মৃণাল সেন। তার তৃতীয় চলচ্চিত্রটি ছিল ‘২২শে শ্রাবণ’। এরপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি মৃণাল সেনকে।

এর ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘ভুবন সোম’। তৎকালীন সময়ের খ্যাতিমান অভিনেতা উৎপল দত্ত অভিনীত এই চলচ্চিত্রটি মৃণালকে আরও মেধাবী ও খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে উপস্থাপন করে চলচ্চিত্র অঙ্গনে। এরপর একের পর এক চলচ্চিত্র উপহার দিতে থাকেন মৃণাল সেন। তার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হল কলকাতা ৭১, ইন্টারভিউ, পদাতিক, একদিন প্রতিদিন, মৃগয়া, আকালের সন্ধানে, তাহাদের কথা, খারিজ, মহাপৃথিবী, অন্তরীন।

মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র

মৃণাল সেন পরিচালিত পদাতিক সিনেমার একটি দৃশ্য; Source Image: THE HINDU

মেধাবী চলচ্চিত্র নির্মাতা মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রগুলো নিজস্ব স্বকীয়তা সম্পন্ন। ভারতীয় সিনেমাকে ভেঙেচুরে নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন মৃণাল সেন। তার চলচ্চিত্রে ফুটে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্রগুলো। রাজনৈতিক, সম্রাজবাদ বিরোধীতসহ তার চলচ্চিত্রে আরো স্থান পেয়েছে তৎকালীন অস্থির কলকাতা, মধবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত জীবন ও সমাজ ব্যাবস্থা, দারিদ্রতা, মানবজীবনের বহুমুখী টানপোড়েনের চিত্র এবং নারীর সামাজিক অবস্থা। বলা যায় এগুলোই ছিল মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রের মূল উপজীব্য।

মানবজীবনের চিরন্তন বাস্তবতা মৃণাল সেন পর্দায় ফুটিয়ে তুলতেন সুনিপুণভাবে। তার সাথে মেখে দিতেন তার মার্ক্সবাদী দর্শন। তবে তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব- সমাজ জীবনের এই বাস্তবতাকে পর্দায় সাজাতেন নিজেস্ব ভঙ্গিমায়। বাস্তবতার গায়ে তিনি সুনিপুণভাবে মেশাতেন সিনেম্যাটিক রং ও শৈল্পিক আবহ। তার বিভিন্ন চলচ্চিত্র দেখলেই গুণী নির্মাতা মৃণাল সেনের এই মুন্সীয়ানা নজরে পড়বে।

অর্জন

দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার গ্রহণের সময় রাষ্ট্রপতি এপিজে আবুল কালামের সাথে ; Image Source: THE HINDU

মৃণাল সেনের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তার সৃষ্টির স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন দেশি-বিদেশি অসংখ্য পুরস্কার। তার চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে বিভিন্ন দেশিয় চলচ্চিত্র উৎসবে। ১৯৮১ সালে দূর্ভিক্ষের ওপর তৈরী করা তার প্রখ্যাত চলচ্চিত্র আকালের সন্ধানের মাধ্যমে জিতে নেন বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের জুরি পুরস্কার।

১৯৮৩ সালে তিনি জয় করেন কান উৎসব। খারিজ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সেবার কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের বিশেষ জুরি পুরস্কার পান তিনি। এছাড়া তিনি পেয়েছেন ভারতীয় বিনোদন জগতের সেরা পুরষ্কার দাদা সাহেব ফালেকে পুরস্কার, ভূষিত হয়েছেন রাষ্ট্রীয় সম্মান পদ্মশ্রীতে। এছাড়া ফ্রান্স সরকার মৃণাল সেনকে কমান্ডার অব দ্য অর্ডার অব আর্টস লেটারস সম্মানে ভূষিত করেন। তাকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে একাধিক প্রামাণ্যচিত্র। এই গুণী নির্মাতা বাংলা ভাষার বাইরেও ছবি তৈরী করেছেন তেলেগু, হিন্দি প্রভৃতি ভাষায়।

মৃণাল সেনের অন্যান্য দিক

আলাপে মগ্ন দই কিংবদন্তী (সত্যজিত ও মৃণাল সেন); Image Source: THE HINDU

ব্যাক্তিগত জীবনে এক সন্তানের জনক মৃণাল সেন ছিলেন একজন রাজনৈতিক সচেতন মানুষ। বাম ঘরানার রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত রাজ্যসভার সদস্যও ছিলেন এই কিংবদন্তী নির্মাতা। বাংলাদেশে জন্মগ্রহনকারী মৃণাল সেনের জন্মভিটার প্রতি ছিল অগাধ টান। ১৯৯০ সালে জন্মভিটার টানে সস্ত্রীক এসেছিলেন বাংলদেশে (তার আগেও দু’বার তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন তবে জন্মভিটায় যাওয়া হয়ে উঠেনি।) দেখতে গিয়েছিলেন শৈশব ও কৈশরের স্মৃতিমাখা জন্মভিটায়।

প্রস্থান

২০১৮ সিলের ৩০ ডিসেম্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নেন এই গুণী চলচ্চিত্র নির্মাতা। মৃত্যু পরবর্তী সময়ে ফুল মাল্য দেয়া, কোথাও শায়িত করে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা এসব প্রথার বিরোধী ছিলেন মৃণাল সেন। তাই তার মৃত্যুর পরও এই শ্রদ্ধা প্রদর্শনের আনুষ্ঠানিকতাগুলো তার নিষেধ অনুযায়ী করা হয়নি।

নিষেধের বৃত্তে এই দৃশ্যমান আনুষ্ঠানিকতা বন্ধ রাখলেও তার জন্য তার সহকর্মীদের বুকের গভীরে লালিত শ্রদ্ধা ও ভালবাসা আটকাতে পারেননি মৃণাল সেন। তার মৃত্যুতে গোটা ভারতে নেমে আসে শোকের ছায়া। নিজ নিজ টুইটার অ্যাকাউন্টে টুইটের মাধ্যমে শোক প্রকাশ করতে থাকেন বিগ বি, মহেশ ভাট, নন্দিতা দাসসহ আরো অনেক বাঘা বাঘা মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইতি ঘটেছিল একটি সোনালী অধ্যায়ের। মৃত্যু পরবর্তী জীবনে ভাল থাকুন মৃণাল সেন।

Featured Image Source: ZEE ২৪ ঘণ্টা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.