কেমন হলো হুয়াওয়ে মেটবুক থার্টিন

বেশ কয়েকবছর গ্রাহক চাহিদা পর্যবেক্ষণ শেষে বাজারে আনা হুয়াওয়ে তাদের সর্বশেষ মডেলের ল্যাপটপে ঠিক তাই উপহার দিয়েছে যাকে বলা চলে অভিজাত ল্যাপটপ। হুয়াওয়ে মেটবুক থার্টিন তাই করে দেখিয়েছে যা একই দামের অন্য কোনো ল্যাপটপেই আপনি দেখতে পাবেন না। এমনকি এরচেয়ে বেশি দামের ল্যাপটপেও এর বেশকিছু ফিচার অনুপস্থিত। সবমিলিয়ে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন জরিপে বছরের সেরা ল্যাপটপ হুয়াওয়ে মেটবুক থার্টিন। যা হয়ত বছরের শেষেও অপরিবর্তিত থাকতে যাচ্ছে।  

এক নজরে-

ইতিবাচক দিক

১। সম্পূর্ণ ইন্টেল কোর প্রসেসিং

২। অসাধারণ গ্রাফিক্স

৩। ওয়েবক্যামের অবস্থান

৪। ল্যাপটপের বাজারমূল্য

গ্রাহকের হাতে মেটবুক থার্টিন; Image Source: huawei.com

নেতিবাচক দিক

১। তুলনামূলক কম মেমোরি

২। থান্ডারবোল্ট থ্রি এর অনুপস্থিতি

হুয়াওয়ে তাদের নতুন ল্যাপটপের জন্য বিগত বছরের সাড়া জাগানো এবং নিজেদের সেরা কাজ মেটবুক এক্স প্রো এর উপর ব্যাপক পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছে। কিন্তু পরীক্ষা শেষে মেটবুক থার্টিন এক্সপ্রো কে অনেকখানিই ছাড়িয়ে গিয়েছে। এবং যার ফলাফল হিসেবে হুয়াওয়ে বাজারে এনেছে আরেকটি সেরার কাতারে থাকার মত ল্যাপটপ।   

পূর্ববর্তী হুয়াওয়ে মেটবুক এক্সপ্রো; Image Source: huawei.com

ল্যাপটপ কনফিগারেশন

সিপিউ : ১.৮ গিগাহার্জ ইন্টেল কোর আই সেভেন-8565U (কোয়াড কোর, ৪.১ গিগাহার্জ পর্যন্ত আপডেটযোগ্য)

গ্রাফিক্স : ইন্টেল ইউএইচডি গ্রাফিক্স ৬২০, এনভিডিয়া জিফোর্স এমএক্স ১৫০

র‍্যাম : ৮ জিবি ডিডিআর থ্রি (২১৩৩ মেগাহার্জ)

স্ক্রিন : ১৩ ইঞ্চি, ১৪৪০ পিক্সেল (২১৬০*১৪৪০, আইপিএস, ৩০০ নিট), টাচ ডিসপ্লে

স্টোরেজ : ৫১২ জিবি

পোর্টস : ২ টি করে ইউএসবি-সি ৩.১, হেডফোন প্লাগ   

মেটবুক থার্টিনে থাকছে অষ্টম জেনারেশনের কোর আইসেভেন; Image Source: huawei.com

কানেক্টিভিটি : ৮০২.১১ এসি ওয়াইফাই, ব্লুটুথ ৪.১

ক্যামেরা : এইচডি (৭২০ পিক্সেল, ০.৯ মেগাপিক্সেল) ওয়েবক্যাম

ভর : ২.৮৭ পাউন্ড (১.৩ কেজি)

আকার : ১১.২৬*৮.৩১*০.৫৯ ইঞ্চি (দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা)

ল্যাপটপ মূল্য এবং বর্তমান বাজার

হুয়াওয়ে এই মুহুর্তে মেটবুক থার্টিন এর দুটি আলাদা কনফিগারেশনে বাজারে এনেছে। একটি এন্ট্রি গ্রেড ভার্সন (entry-grade version) এবং অন্যটি হাই এন্ড ভার্সন (high-end version)। যদিও দুটিতেই তেরো ইঞ্চির ডিসপ্লে এবং প্রতি ইঞ্চিতে ২২০ পিক্সেল সক্ষমতা থাকছে। এছাড়া মনিটরের দুই তৃতীয়াংশে রয়েছে টাচ স্ক্রিন এবং ৮ জিবি মেমোরি সুবিধা। সেইসাথে পাওয়ার বাটনে থাকছে আধুনিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট লক।

সবচেয়ে সহজলভ্য সংস্করণে অষ্টম জেনারেশন ইন্টেল কোর আইফাইভ প্রসেসরের সাথে থাকছে ২৫৬ জিবি মেমোরি সুবিধা, যা যুক্তরাষ্ট্রে পাওয়া যাচ্ছে ৯৯৯ ডলারে (৭৮৫ ইউরো এবং ১০৪৩ অস্ট্রেলিয়ান ডলার)। এছাড়া ১২৯৯ মার্কিন ডলারে (প্রায় ১০২০ ইউরো এবং ১৮২৫ অস্ট্রেলিয়ান ডলার মূল্যে) পাওয়া যাচ্ছে ইন্টেল কোর আই সেভেন প্রসেসর, এনভিডিয়া এমএক্স ১৫০ গ্রাফিক্স এবং ৫১২ জিবি মেমোরি সম্বলিত উন্নত সংস্করণ। 

বাজারমূল্যে অনেকটাই এগিয়ে থাকছে মেটবুক থার্টিন; Image Source: huawei.com

দুই সংস্করণেই থাকছে ইউএসবি সি ডক এবং মাইক্রোসফট অফিস ৩৬৫ এর এক বছর ফ্রি ব্যবহারের সুবিধা। তবে বাংলাদেশের সাপেক্ষে এর দাম খুবই বেশি মনে হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে বেশ সুনাম করে নিয়েছে হুয়াওয়ে। অ্যাপলের সবশেষ ম্যাকবুক থেকে এর দাম প্রায় ১০০ ডলার কম এবং সমসাময়িক অন্যান্য ল্যাপটপ যেমন ডেল এক্সপিএস থার্টিন এর সাথে প্রায় ভারসাম্যপূর্ণ।

হুয়াওয়ের সেরা ল্যাপটপ মেটবুক থার্টিন; Image Source: engadget.com

যদিও প্রতিযোগিতার প্রশ্নে মূল জায়গায় থাকছে হুয়াওয়ে তার প্রতিদ্বন্দীদের তুলনায় ল্যাপটপে ঠিক কী কী সুবিধা দিতে সক্ষম। তুলনার প্রশ্নে মেটবুক থার্টিন, ডেল এর এক্সপিএস থার্টিন এবং ম্যাকবুকের মতোই সমান কার্যকর তো বটেই, কিছু ক্ষেত্রে বেশ এগিয়েই থাকবে চীনের কোম্পানি হুয়াওয়ে। এখানে উল্লেখ্য ডেল এক্সপিএস থার্টিন কিংবা ম্যাকবুক এয়ার কোনোটিই হুয়াওয়ের এই ল্যাপটপের মত অসাধারণ গ্রাফিক্স গ্রাহকদের উপহার দিতে পারেনি। এনভিডিয়া এমএক্স ১৫০ গ্রাফিক্সের মাপকাঠিতে ছোট হলেও অন্য যেকোনো ল্যাপটপের তুলনায় এই ল্যাপটপে গেমিং এবং ভিডিও সংক্রান্ত কাজে গ্রাহককে দারুণ অভিজ্ঞতা দেবে। 

ফেব্রুয়ারি মাসেই মার্কিন রিটেইলে বাজারে আসার কথা ছিল হুয়াওয়ে মেটবুক থার্টিন এর। যদিও এর আন্তর্জাতিক বাজারজাত নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নিশ্চয়তা দেয়া হয়নি।

ডিসপ্লে এবং ডিজাইন

আপনি যদি এই ধারণা নিয়ে থাকেন মেটবুক থার্টিন হুয়াওয়ের পূর্ববর্তী ল্যাপটপ মেটবুক এক্স প্রো ২০১৮ এর উন্নত এবং নতুন একটি সংস্করণ তবে আপনার ধারণা ভুল নয়। তবে হুয়াওয়ে তাদের দুই ল্যাপটপকে উপস্থাপন করেছে সম্পূর্ণ আলাদা রূপে। বাহ্যিকভাবে দেখতে গেলে মেটবুক থার্টিন এবং এক্স প্রো দেখতে একেবারেই একই। কেবলমাত্র পার্থক্য মেটবুক থার্টিন আকারে খানিকটা ছোট।

মেটবুক থার্টিন স্পেস গ্রে সংস্করণ; Image Source: huawei.com

ল্যাপটপের গঠন আগের মতই অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি। রঙের ক্ষেত্রে আপনার হাতে অপশন থাকছে ধূসর কিংবা সিলভার। ল্যাপটপ খুললেই বাটনের দিক থেকে পরিবর্তন চোখে আসবে। সেই সাথে দেখতে পাবেন ওয়েবক্যামের অবস্থান আরও পরিবর্তিত হয়েছে। অবশ্য এই ওয়েবক্যামে আপনি খুব বেশি উচ্ছাসিত নাও হতে পারেন। ৭২০ রেজ্যুলেশনে এই ওয়েবক্যামের ক্ষমতা কেবল ০.৯ মেগাপিক্সেল। তাই ভিডিও চ্যাট করার সময় আপনাকে খুব যে অসাধারণ লাগবে ওপাশ থেকে, তেমনটি ভাবার কারণ নেই।

আকার আয়তনেও দারুণ উপভোগ্য ল্যাপটপ হতে যাচ্ছে মেটবুক থার্টিন। ০.৫৯ ইঞ্চি (১৪.৯ মিলিমিটার) পুরুত্ব এবং ২.৮৭ পাউন্ড (১.৩ কিলোগ্রাম) ভরের এই ল্যাপটপ বহনের জন্য যেমন উপযোগী তেমনি অ্যাপল ম্যাকবুকের তুলনায় খানিক পাতলাও বটে। ইন্টেলের সম্পূর্ণ মোবাইল প্রসেসর এবং এনভিডিয়া গ্রাফিক্স চিপ ধারণ করা কোনো ল্যাপটপের পক্ষে এই ভর তুলনামূলক কমই বলা চলে।

মেটবুক থার্টিন এর মনোমুগ্ধকর কিবোর্ড; Image Source: huawei.com

হুয়াওয়ে তাদের ল্যাপটপে নতুন মুগ্ধতা নিয়ে এসেছে এর কিবোর্ড এবং টাচপ্যাড অংশে। এর দারুণ কিবোর্ডে যেকোনো টাইপিং হয়ে উঠবে অনেক বেশি আনন্দদায়ক। এছাড়া মাইক্রোসফটের প্রেসিশন টাচপ্যাডের কল্যাণে টাচপ্যাড অংশটি আরো বেশ খানিকটা জায়গা দখল করেছে যা ব্যবহারকারীর জন্য খুবই উপযোগী হতে যাচ্ছে। সেইসাথে মেটবুক থার্টিনের টাচস্ক্রিনেও এসেছে উল্লেখযোগ্য কিছু পরিবর্তন। ১৩ ইঞ্চির স্ক্রিনে ১৪৪০ পিক্সেল ডিসপ্লেতে টাচ সুবিধা এই ল্যাপটপের অন্যতম একটি আকর্ষণীয় দিক। ১০০০:১ অনুপাতের কন্ট্রাস্ট এবং ৩০০ এনআইটি ব্রাইটনেস আপনার ল্যাপটপের সামনের থাকা অবস্থায় দারুণ কিছু অভিজ্ঞতা দেবে।

সবমিলিয়ে মেটবুক থার্টিন প্রতিযোগিতার বাজার থেকে শুরু করে, নিজেদের ইতিহাস আর গ্রাহক সমাজে এখন পর্যন্ত বেশ ভালোভাবেই টিকে আছে। তবে সামনের দিনগুলোয় ডেল বা অ্যাপল, হুয়াওয়ের মেটবুক থার্টিনকে টেক্কা দিতে ঠিক কী নিয়ে আসছে তা জানার জন্যই আপাতত অপেক্ষা প্রযুক্তি বোদ্ধাদের।  

Feature image – engadget.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.