হেয়ার জেলের কিছু ক্ষতিকর দিক

দিনের শুরুতে নিজেকে পরিপাটি করে সাজাতে কাপড়চোপড়ের সাথে চুলটাকেও ঠিক করে নেন অনেকেই। বাইরের প্রচণ্ড বাতাসেও যেন আপনার গুছিয়ে আনা সাজ নষ্ট না হয়ে যায় সেজন্যে কাপড়ে পিন লাগালেও চুলের ব্যাপারে একটু চিন্তায় পড়ে যান অনেকেই। তাই চুলকে ঠিকঠাক করে সারাদিনের জন্য সেই সাজ ধরে রাখতে চুলে ব্যবহার করা হয় হেয়ার জেল।

কিন্তু এই সাজের ভিড়ে আপনার সাধের চুলগুলোর ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে না তো? আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় হেয়ার জেলের কিছু সম্ভাব্য ক্ষতিকর দিক।

১. চুলকে অনার্দ্র এবং রুক্ষ করে ফেলা

হেয়ার জেলের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে এটি চুলের স্টাইল পরিবর্তন করবে না। অর্থাৎ আপনি যেভাবে চুল আঁচড়াবেন চুল সেভাবেই থাকবে। আর এজন্য হেয়ার জেলে প্রচুর পরিমাণে অ্যালকোহল এবং শক্তিশালী জারক পদার্থ বিদ্যমান। এই দুই উপাদান চুলের এবং মাথার তালুর আর্দ্রতা সম্পূর্ণভাবে শোষণ করে।

রুক্ষ ত্বক এবং চুল; Source: Anveya Living

ফলে চুল হয়ে উঠে শুষ্ক এবং রুক্ষ। হেয়ার জেল মাথার আর্দ্রতার মাত্রাকে সম্পূর্ণ এলোমেলো করে ফেলে এবং মাথার প্রয়োজনীয় সেবাম উৎপন্ন করতে বাধা দেয়। ফলাফলস্বরূপ, চুল রুক্ষ হয়ে যায়, চুলের প্রান্তভাগ ফেটে যায় এবং মাথায় চুলকানির উদ্রেক হয়। কাজেই জেল প্রতিনিয়ত ব্যবহারে ধীরে ধীরে আপনার চুল অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যায় আর এই চুল নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আপনাকে আরো বেশি করে জেল ব্যবহার করতে হয়।

২. চুল পড়া

আমরা আগের পয়েন্টে দেখলাম জেল ব্যবহারে ধীরে ধীরে চুল রুক্ষ হয়ে যায়। এতে চুলের প্রান্তভাগ ফাটতে শুরু করে এবং দুর্বল চুলগুলো পড়ে যায়।

চুলের প্রান্তভাগ বা আগা ফেটে যায়; Source: Divas Life

হেয়ার জেলে যে রাসায়নিক পদার্থগুলো রয়েছে সেগুলো এবং পরিবেশের ধূলাবালিতে থাকা ক্ষতিকর উপাদান মিলে মাথার মৃত চামড়া বাড়িয়ে তোলে এবং সেবামের উৎপাদন অনিয়ন্ত্রিত করে ফেলে। তাই মাথা তৈলাক্ত হয়ে উঠে।

চুল পড়া; Source: Womens Fitness

মাথার এই পরিবেশের কারণে চুল পড়ার হার আরও বেড়ে যায়। দীর্ঘ সময়ে ধরে নিয়মিত চুল পড়ার কারণে চুল ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে এবং মাথায় টাক পড়ে যায়। আর স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর প্রভাবগুলো আমাদের বুঝতে দেরি হয় এবং বুঝে তা প্রতিরোধ ও প্রতিকার করতে আরো বেশি সময় লেগে যায়।

৩. খুশকি বৃদ্ধি করা

চুলের শুষ্কতা ও অপুষ্টিতে ভোগা চুলের গোড়া বৃদ্ধির কারণে চুলে জ্বালা-পোড়া করে, চুলকানি বৃদ্ধি পায় এবং চুলকে অস্থিতিশীল করে তোলে। এর শেষ ধাপ হচ্ছে চুলে খুশকি বেড়ে যাওয়া। সেবামের অনিয়ন্ত্রিত উৎপাদন, চুলে মৃত চামড়ার বৃদ্ধি পাওয়া এবং চুলের শক্তি কমে যাওয়া থেকে খুশকির বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে।

খুশকি কারোই কাম্য নয়; Source: Balding Beards

এই অবস্থা চলতে থাকলে চুলে খুশকি বৃদ্ধি চরমে পৌঁছে এবং একসময় মাথার ত্বকে ব্রণ উঠতে শুরু করে যা খুবই অস্বস্তিকর, চুলকানির উদ্রেককারী এবং ব্যথাদায়ক। খুশকি বৃদ্ধির কারণে মাথার একটু নাড়াচাড়াতেই চুল থেকে খুশকি ঝরে পড়তে থাকে যা যথেষ্ট বিরক্তিকর এবং একই সাথে অস্বস্তিকর একটা অবস্থার সৃষ্টি করে।

৪. চুলকে বর্ণহীন করা এবং ধীরে ধীরে নষ্ট করে ফেলা

উপরের ক্ষতিগুলোর পাশাপাশি হেয়ার জেল আপনার চুলের আরো অনেক ক্ষতিসাধন করে থাকে। যেহেতু জেল চুলের আর্দ্রতা কেড়ে নেয় এবং চুলকে ধীরে ধীরে পুষ্টিহীনতার দিকে ঠেলে দেয় তাই মাথার ত্বকে পিএইচ এর মাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং চুল স্বাস্থ্যহীন হয়ে পড়ে। পাশাপাশি হেয়ার জেলে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থগুলোও মাথার চুলে ক্ষতিকর প্রভাব রেখে যায় এবং ক্রমাগত ব্যবহারে চুলের সাধারণ রং আস্তে আস্তে বর্ণহীন হয় এবং চুল বিবর্ণ হয়ে যায়। চুল তাই সঠিক সময়ের আগেই সাদা হয়ে যায়, চুলে পাক ধরে এবং বয়স না হলেও ধূসর ও বর্ণহীন চুলের কারণে আপনাকে তখন বয়স্ক বলে মনে হবে।

চুল স্বাভাবিক রং হারায়; Source: Medical News Today

এছাড়াও হেয়ার জেলের ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থগুলোর কারণে মানবদেহে যে ক্ষতিকর প্রভাবগুলো দেখা যায় সেগুলো হচ্ছে কিডনি ও ফুসফুসের সংক্রামণ, নিউমোনিয়া, শরীরের কোষে ও টিস্যুতে বিষক্রিয়া, ত্বকের ক্ষতিসাধন, শ্বাসকষ্ট, ত্বকের ব্ল্যাকহেড ও অন্যান্য ক্ষতিকর প্রভাব ইত্যাদি।

ক্ষতিকর প্রভাব এড়িয়ে চলবেন যেভাবে

যদি আপনি চুলকে প্রাকৃতিকভাবেই সুস্থ এবং পুষ্টিকর করতে চান তবে সবচেয়ে জরুরি ব্যাপারটিই হচ্ছে এই সব রাসায়নিক পদার্থগুলো সম্পূর্ণভাবে বাদ দিয়ে ১০০% প্রাকৃতিক উপাদানসমৃদ্ধ কিছু ব্যবহার করা। কিন্তু আগে থেকেই যদি হেয়ার জেলের উপর আপনার নির্ভরতা থাকে এবং আপনাকে যদি দ্রুতহাতে প্রস্তুত হতে হয় তবে রাসায়নিক পদার্থসহ এই হেয়ার জেলগুলো যত সম্ভব কম ব্যবহার করুন এবং ধীরে ধীরে এগুলোর উপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে আনুন।

হেয়ার জেল ব্যবহারের সময়ে সম্ভব হলে একটু বেশি পানি ব্যবহার করুন যেন জেল খুব বেশি ব্যবহার করা না লাগে এবং চুল যথেষ্ট আর্দ্র থাকে। পাশাপাশি যতো দ্রুত সম্ভব চুল থেকে জেল ভালো করে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। সম্পূর্ণ ড্রাই জেলগুলো এড়িয়ে চলুন। আবার ইচ্ছে করলেই আপনি হেয়ার জেল ব্যবহার ছাড়াই সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী স্টাইল নিয়ে হাজির হতে পারেন বন্ধুদের আড্ডায়। যদি হেয়ার জেল কিনতেই হয় তবে আস্থাসম্পন্ন ব্র্যান্ডের দোকান থেকে একটু বেশি সময় নিয়ে ভালো করে দেখে এবং যাচাই করে কিনুন যেখানে জেলটি নকল হওয়ার সম্ভাবনা একদম কমে যায়।

হয়তো একটু বেশি মূল্য প্রয়োজন হতে পারে কিন্তু অন্তত আপনি পণ্যটি আসল পাবেন এতে কোন সন্দেহ নেই। সম্ভব হলে একজন হেয়ার এক্সপার্টের সংগে কথা বলে এরপর চুলে জেল ব্যবহার করা শুরু করুন। এতে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থগুলো সম্বন্ধে আপনি নিজেই সচেতন হবেন এবং ক্ষতিকর পদার্থ দিয়ে তৈরি হেয়ার জেল এড়িয়ে চলবেন।

ফিচার ইমেজ Style Craze

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.