টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির জয় জয়কার

টাঙ্গাইলের শাড়ির প্রচলন ও প্রসার বেশ আগে থেকে। ঘরোয়া পরিবেশে ব্যবহার করা থেকে শুরু করে অফিস, আদালত ও নিত্যদিনের কার্যক্রম সম্পাদন করা যায় টাঙ্গাইলের শাড়ি পরে। টাঙ্গাইলের শাড়ি নারীদের পছন্দের শাড়িগুলোর মধ্যে অন্যতম। মাঝ বয়সী নারী ছাড়াও যেকোনো বয়সের নারী টাঙ্গাইলের শাড়ি পরতে ভালবাসেন।

হ্যাঙারে ঝোলানো শাড়ি; Source: somewhere in… blog

টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়িগুলো পরতে বেশ আরামদায়ক। দামেও সাশ্রয়ী। সুপ্রাচীন কাল থেকে টাঙ্গাইল শাড়িগুলো আমাদের ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে আসছে। টাঙ্গাইলের দক্ষ কারিগরেরা বংশানুক্রমে এই শাড়ি তৈরি করে। তারা তাদের নিপুণ দক্ষতা দিয়ে এই শাড়িগুলো তৈরি করে।

টাঙ্গাইল শাড়ির আঁচল; Source:logo

বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা ও হিউয়েন সাঙ এর ভ্রমণ কাহিনীতে টাঙ্গাইল শাড়ির কথা উল্লেখ আছে। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে টাঙ্গাইল শাড়ির আভিজাত্যের কথা! টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়িগুলো শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, দেশের গন্ডী পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী অর্জন করেছে সুখ্যাতি। টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে একটি প্রবাদও রয়েছে। তা হলো

“নদী-চর, খাল-বিল, গজারীর বন

টাঙ্গাইল শাড়ি তার গর্বের ধন”

ইতিহাস ও ঐতিহ্যে টাঙ্গাইলের শাড়ি

তাঁতিরা ঠিক কবে থেকে টাঙ্গাইল শাড়ি তৈরি করছে তার ইতিহাস কেউ জানে না। তবে জানা যায় এই শাড়ি বুনন করছে হাজার বছর ধরে। বসাক শ্রেণির তাঁতপল্লীর তাঁতিরা টাঙ্গাইল শাড়ির জনপ্রিয়তার অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। তারা বংশানুক্রমে এই শাড়ি তৈরি করে চলছে। টাঙ্গাইলের তাঁতিরা শুধুমাত্র সুতি সুতাকে উপজীব্য করে নিজের দক্ষতায় তৈরি করেন টাঙ্গাইলের শাড়ি। যা বেশ আরামদায়ক হয়। টাঙ্গাইল শাড়ি দেখতেও বেশ সুন্দর। গরমে পরার জন্য এই শাড়ি উত্তম।

মনোরম শাড়ি; Source: logo

আদিকাল থেকে বসাক শ্রেণির তাঁতিরা তন্তুবায়ী গোত্রের লোক। শুরুর দিকে তারা সিন্ধু অববাহিকা থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ হয়ে চলে আসেন বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তাঁতিরা রাজশাহী থেকে চলে আসে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর ও  ঢাকার ধামরাইয়ে। তারপর তাঁতিরা ভালো আবহাওয়ার খোঁজ করতে করতে চলে আসে টাঙ্গাইল।

টাঙ্গাইলের তাঁত; Source: dmpnews.org

এখানেই তারা থেকে যায়। টাঙ্গাইলের আবহাওয়া তাঁত বোনার জন্য উপযুক্ত বলে তারা পুরোদমে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণে অনেক তাঁতি ভারতে চলে যায়। এ সময় অন্যান্য লোকেরাও তাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে বসাক শ্রেণির তাঁতিদের মতোই তারা দক্ষ হয়ে ওঠে।

টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি এতটা জনপ্রিয় যার ফলে অনেকেই তাঁতের শাড়ি বলতে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়িকে বোঝে। এই শাড়ি তৈরিতে অত্যন্ত মিহি সুতা ব্যবহার করা হয় এবং শাড়ি বুননের সময় গুণগত মানের দিকে লক্ষ্য রাখা হয়। শাড়ির রঙ, বুনন, নকশা ইত্যাদি অন্য যেকোনো শাড়ির চেয়ে ভিন্ন হয়।

টাঙ্গাইল শাড়ির বাহার; Source: logo

টাঙ্গাইল জেলার এগারোটি উপজেলাকে বলা হয় তাঁতবহুল এলাকা। এছাড়াও টাঙ্গাইল সদর, নাগরপুর, সখীপুর, কালিহাতী ইত্যাদি এলাকাকে তাঁতবহুল এলাকা বলা হয়। এসব এলাকায় দিন দুপুরে, রাত দুপুরে শোনা যায় মাকুর খটখট শব্দ। খট খট শব্দের অন্তরালেই তাঁতিরা পরম দরদ দিয়ে বুনতে থাকে শাড়ি।

বৈশিষ্ট্য

  • বিদেশী বণিক চক্রের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মসলিন কাপড় হারিয়ে গেলেও টাঙ্গাইল শাড়ি হারায়নি। বরং টাঙ্গাইল শাড়ি তার জায়গা ধরে রেখেছে স্বার্থক উত্তরাধিকারী হয়ে।
  •  টাঙ্গাইল শাড়ির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো পাড় বা কিনারের কাজ।  
  • নব্বইয়ের দশকে টাঙ্গাইল শাড়িতে ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হয়। এসময় কটন শাড়ির পাশাপাশি টাঙ্গাইল সফট সিল্ক শাড়ির প্রচলন শুরু হয়। সফট শিল্ক শাড়ি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে তার আকর্ষণীয় ডিজাইন, উন্নত বুনন কৌশলের কারণে।
  • সফট সিল্ক, হাফসিল্ক শাড়ি ছাড়াও তাঁতিরা তৈরি করছে আনারকলি, দেবদাস, জরিপাড়, স্বর্নচুড়, বালুচরি, কুমকুম, সানন্দা, কটকি, সুতিপাড়, নীলাম্বরী, ময়ূরকণ্ঠী, ইককাত, হাজারবুটি ইত্যাদি শাড়ি।
  • আগে পদ্মপাড়, মাধবীলতা, মরবি, তেরবি, কুঞ্জলতা, লতাপাতা পাড়ের শাড়ির তৈরি করা হলেও এখন তাঁতিরা পাড়ে পরিবর্তন এনেছে।
  • পুরুষ ও নারী তাঁতিরা মিলে শাড়ি তৈরির কাজ করে। মহিলা রঙ করা ও জরির কাজে সহায়তা করে। পুরুষেরা তাঁত বোনে ও চরকা কাটে।
  • তাঁতের শাড়ির জমিনে নানা নকশা যেমন ফুল তোলে শাড়িকে চমৎকার করে তোলে।

টাঙ্গাইল শাড়ির প্রকারভেদ

টাঙ্গাইল শাড়ি বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। যেমন

  • সুতি শাড়ি
  • আধা রেশমি শাড়ি
  • হাফ সিল্ক শাড়ি
  • সফট সিল্ক শাড়ি
  • সুতি জামদানি শাড়ি
  • বালুচুরি শাড়ি
  • ডাংগ্য শাড়ি
  • গ্যাস মারচেন্ডাইজড শাড়ি
  • টুইস্টেড সুতি শাড়ি

টাঙ্গাইল শাড়ির প্রাপ্তিস্থান

টাঙ্গাইল শাড়ির হাট বসে মূল শহর থেকে দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত বাজিতপুরে প্রতি সোম ও শুক্রবার। ভোর রাত থেকে হাট শুরু হয় এবং সকাল দশটা পর্যন্ত চলে। এখানে মহাজনরা পাইকারি দরে শাড়ি কিনে নিয়ে বড় বড় মার্কেটে সরবরাহ করে।

সফট সিল্ক শাড়ি; Source: somewhere in… blog

টাঙ্গাইল শাড়ি দেশের বিভিন্ন মার্কেট ও শপিং কমপ্লেক্সে পাওয়া যায়। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করা যেকোনো পেশার নারীরা টাঙ্গাইল শাড়ি পরতে ভালোবাসে। শুধু দেশের অভ্যন্তরে নয়, বিদেশেও এর সুনাম রয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ইউরোপ, আমেরিকার বিভিন্ন দেশ, জাপান, সৌদিআরব ও ভারতের কিছু রাজ্যে এ শাড়ির সুখ্যাতি রয়েছে।

দরদাম

টাঙ্গাইল শাড়ির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে সকল পেশার মানুষের কথা চিন্তা করে। এ শাড়ির ডিজাইন, মান, বুনন ও নকশার তারতম্য ভেদে শাড়ির দামের তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। তবে জামদানি ও সিল্কের দাম অন্যান্য শাড়ির তুলনায় একটু বেশি।

সফট সিল্ক শাড়ির দাম ৯৫০- ৫০০০ টাকা, সফট কটন শাড়ির দাম ৬৫০- ৩৫০০ টাকা, বালুচরি শাড়ির দাম ১৪০০- ২৮৫০ টাকা, তসর সিল্ক শাড়ির দাম ১৯০০- ৪৫০০ টাকা, সম্বলপুরী শাড়ির দাম ৭৫০- ৩০০০ টাকা, সিল্ক কাতান শাড়ির দাম ২৫০০- ১০০০০ টাকা এবং অন্যান্য শাড়ির দাম ৬০০-৫০০০ টাকা।

Featured Image Source: dmpnews.org

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.