ডুকাটি মোটরসাইকেল ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কিছু অজানা তথ্য

'source: https://www.phmotorcycles.co.uk'

দেশে মোটরসাইকেলের প্রতি আগ্রহ নেই, মোটরসাইকেলপ্রেমী নেই এরকম কথাটা যদি বলা হয় তবে সেটা একটা মারাত্মক ভুল হবে। ঢাকার রাস্তায় নামলেই তার প্রমাণ মিলবে এবং বেশি না, মাত্র দুই এক বছর আগের পরিসংখ্যান দেখলেই সেটা পরিষ্কার হয়ে যাবে যে বর্তমানে মোটরসাইকেলের প্রতি ভালোবাসা কিরূপ। আর তরুণ প্রজন্মের আকর্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দুই হচ্ছে এই মোটরসাইকেল। কোথায় কোন ব্র্যান্ডের বাইক পাওয়া যাচ্ছে, কোন সালে কোন বাইকটি এসেছে, কোনটা কেনা ভালো হবে এই বিষয়গুলো এখন তাদের নখদর্পনে। তাই হোন্ডা, সুজুকির পরে এবার থাকছে আরেকটি দারুণ মোটরসাইকেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডুকাটি নিয়ে আয়োজন। চলুন জানি এই মোটরসাইকেল নির্মাতা কোম্পানি ও তাদের কিছু মোটরসাইকেলের মডেল সম্পর্কে।

ডুকাটি নামক মোটরসাইকেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯২৬ সালে ইতালির বোলোনিয়া শহরে। প্রথম দিকে তাদের মূল সংস্থা প্রতিষ্ঠান ছিল ল্যাম্বোরগিনি নামক ইতালিয়ান গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। তবে নানান কারণে কোম্পানির মালিকানা বারে বারে পরিবর্তিত হয়েছে। কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আন্টোনিও, অ্যাদ্রিয়ানো, ব্রুনো ও মার্সেলো ডুকাটি নামক চার ব্যক্তি। বর্তমানে কোম্পানিটির চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত আছেন রুপেরট স্টাডলার এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত আছেন ক্লাউডিও ডোমিনিকেলি। শেষ খবর অনুযায়ী তাদের মোট পণ্য উৎপাদনের পরিমাণ ৫৫ হাজার ৫০০ ইউনিট এবং আয়ের পরিমাণ ৭৩১ মিলিয়ন ইউরো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ডুকাটি কোম্পানি

‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ; source: wallpapercave.com’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল এবং সে সময়ে ডুকাটি কোম্পানির কর্মকর্তারা সবর্দাই ভয়ে ভয়ে থাকতেন কখন না কি যেন হয়ে যায় তাদের কোম্পানিতে। তাদের ভয়টি সত্য হয়েছিল এবং তাদের কোম্পানিতে বোমাও পড়েছিল যার ফলে কোম্পানিটি প্রায় ধবংসপ্রাপ্ত হয়ে যায়। এর ফলে কোম্পানিটি বেশ কিছু সময় ধরে বন্ধও ছিল তবে ধীরে ধীরে কোম্পানিটি তাদের খারাপ সময় কাটিয়ে ওঠে এবং আবার ব্যবসা ও মোটরসাইকেল তৈরি করা শুরু করে।

মোটরবাইকের জন্য প্রথম মোটর তৈরি

‘কুক্কিওলো মোটরবাইক; source: assets.hemmings.com’

মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ডুকাটির প্রধান ব্যবসা কিংবা মোটরসাইকেল প্রস্তুতের কাজ পুরোদমে এবং নতুন উদ্দ্যমেও শুরু হয়েছিল। তারা তাদের বাইকগুলোর নাম দিয়েছিল কুক্কিওলো। যা সাধারণত একটা ছোট মোটর দ্বারা চলতো আর সেই মোটরটিও তারা প্রথম তৈরি করেছিল। তবে ছবিতে দেখা এই সাইকেল দেখে বলাই যায় এটি শুধু ধনীদের সন্তানদের জন্য একটা খেলনা ছিল। যদিও সেসময় ডুকাটির দুই লক্ষাধিক কুক্কিওলো মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছিল। তবে ১৯৫০ সাল থেকে কোম্পানির মোড় ঘুরে যায় এবং তারা পুরোদমে উঠে পড়ে লেগে যায় মোটরবাইক তৈরির জন্যে।

ডুকাটির প্রথম মোটরসাইকেল

‘ডুকাটির প্রথম মোটরবাইক; source: onlymotorbikes.com’

প্রথম মোটর তৈরি করার পর থেকেই তাদের কোম্পানি সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করেছিল, তাই খেলনা বাইক বাদ দিয়ে এবার তারা চিন্তা করলো সত্যিকারের বাইক বানানোর জন্য। যেই কথা সেই কাজ, মোটর ব্যবহার করেই তারা তাদের প্রথম বাইকটি তৈরি করে ফেলেছিল, যদিও তখনও কুক্কিওলা নামটি বাদ যায়নি। বাইকটি ছিল ৪৮ সিসির, সর্বোচ্চ গতিবেগ ৪০ মাইল/ঘণ্টা এবং ওজনে ৯৮ পাউন্ড ছিল। এতে ছিল ১৫ মি.মি. কার্বুরেটর এবং প্রতি গ্যালনে ২০০ মাইল পথ পাড়ি দিতে পারতো। তারপরে যখন তারা বাজারে বিক্রির জন্য বাইকটি নিয়ে আসলো তখন তারা নাম পরিবর্তনের চিন্তা করলো এবং তাদের প্রথম মোটরবাইকের দুটি মডেল বাজারে আসলো, ৫৫এম ও ৬৫টিএল নামে।

কোম্পানির কর্মকর্তা সংখ্যা

‘ডুকাটির কর্মকর্তা; source: www.cycleworld.com’

যখনই কোম্পানির সফলতা আসতে শুরু করলো একে একে বিক্রিও বাড়তে থাকলো, সেই সাথে বাড়তে লাগলো উৎপাদনও। আর তাই প্রয়োজন পড়লো অনেক বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীর। ১৯৩৬ সালের দিকে তাদের কোম্পানির কর্মকর্তা সংখ্যা ছিল ১২০০, যা বর্তমানে দুই হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছে। আর তাদের মোট কর্মকর্তা-কর্মচারীর ৩০ শতাংশ মহিলা কর্মচারী, যারা কাজ করে চলেছেন প্রতিনিয়ত।

বাইক নির্মাণের পাশাপাশি অন্য ব্যবসা

‘ডুকাটি রেডিও; source: upload.wikimedia.org’

‘ডুকাটি রেজর; source: i.ytimg.com’

প্রতিটি কোম্পানিরই কিছু না কিছু সহকারী ব্যবসা থাকে, ডুকাটির ক্ষেত্রেও তাই প্রযোজ্য। হোন্ডা, সুজুকি এবং ডুকাটি তিনটি কোম্পানিরই আরো সহকারী ব্যবসা রয়েছে। হোন্ডা যেমন জমিজমা কিংবা চাষাবাদ সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি তৈরি করে এবং সুজুকি পিয়ানো তৈরি করে। তেমনি ডুকাটি তৈরি করে রেজর এবং রেডিও। তবে শুরুরদিকে তারা রিলযুক্ত প্রজেক্টরও তৈরি করতো যা বর্তমানে বিলুপ্ত।

হাতে তৈরি মোটরসাইকেল

‘ডুকাটি মনস্টার; source: images.ctfassets.net’

প্রযুক্তির এই যুগে যখন সব গাড়ি এবং মোটরসাইকেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান তাদের সকল পণ্য তৈরি করছে সম্পূর্ণ হাতের স্পর্শ ছাড়াই সেখানে ডুকাটি কিনা হাতে তৈরি করে মোটরবাইক? কি, অবাক হচ্ছেন? অবাক হবারই কথা। তবে কথাটা অবশ্যই সত্যি। তাই হয়তো অন্যান্য কোম্পানির তুলনায় তাদের কর্মকর্তাদের সংখ্যাটাও বেশি। তবে হাতের সুনিপুণ স্পর্শ এবং তাদের কারিগর-ডিজাইনারদের সূক্ষ্ণ সব বিষয়াবলি ধরে রাখতেই আজও তারা হাতে তৈরি করে তাদের মোটরবাইকগুলো। আর প্রতিটি মোটরবাইক তৈরির পরে তারা একেকটি করে ডকুমেন্টেশন ভিডিও করে রাখে। আর একেকটি মনস্টার মডেল তৈরি করতে তাদের দক্ষ কর্মকর্তাদের সময় লাগে মাত্র ৮৮ মিনিট। আর তারা প্রায় এখন পর্যন্ত ৩ লক্ষেরও বেশি মনস্টার মডেল বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছে।

দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে কাজ করা

‘ডুকাটি ডিয়াভেল; source: images.ctfassets.net’

১৯৫৩ সালের কথা, কোম্পানিটি বুঝতে পারলো প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে এবং ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করতে হলে তাদেরকে একটু ভিন্ন পথে হাঁটতে হবে, তাই তারা তাদের উৎপাদন ব্যবস্থাকে দুই ভাগে ভাগ করে ফেললো। ডুকাটি ইলেকট্রোনিকা তৈরি করতো বাইকের জন্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিগুলো এবং ডুকাটি মেকানিকা এসপিএ তৈরি করতো মেকানিক্যাল ও ইঞ্জিন সংক্রান্ত যন্ত্রপাতিগুলো। যার ফলে ১৯৫৪ সালে তারা দৈনিক ১২০ টি করে মোটরসাইকেল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল।

ডুকাটি ফ্যাক্টরি ও জাদুঘর

‘ডুকাটি ফ্যাক্টরি; source: motorvalley.it’

‘ডুকাটি জাদুঘর; source: www.avrvm.it’

ডুকাটির আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে তাদের কারখানা এবং তাদের জাদুঘর। তাদের জাদুঘরে রয়েছে কোম্পানির শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাইক নির্মাণের সাথে জড়িত নানান পণ্য,যন্ত্রপাতি এবং নানান স্মৃতিবিজড়িত ছবির ফ্রেম। ১৯৯৮ সাল থেকে তাদের কোম্পানির কারখানা এবং জাদুঘর পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছিল। আর সেখানে একসাথে ৬ লক্ষ মানুষ পরিদর্শনে যেতে পারবে একই সাথে এবং কারোর কোনোরকম অসুবিধা হবে না পরিদর্শনের ক্ষেত্রে।

অডির মালিকানা

‘অডি কর্তৃক মালিকানা গ্রহণ; source: atlantablackstar.com’

আগেই বলা হয়েছে ডুকাটির মালিকানা বার বার পরিবর্তিত হয়েছে। ২০১২ সালে অডি নামক একটি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠাতা কোম্পানি ডুকাটির মালিকানা গৃহীত হয়। বর্তমানে অডি ভক্সওয়াগেন গ্রুপ নামক আরেকটি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের অন্তর্গত। ডুকাটিকে কেনার জন্য অডির ৯০৯ মিলিয়ন ডলার (প্রকৃতপক্ষে ১.০২ বিলিয়ন ডলার) ব্যয় করতে হয়েছিল।

এই ছিল ডুকাটি নামক মোটরবাইক ও বাইক নির্মাতা কোম্পানি সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য। সামনে থাকছে অন্য কিছু নিয়ে আয়োজন।

সোর্স: P&H Motorcycles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.