সুজুকি মোটরসাইকেলের অজানা তথ্য

গাড়ি নিয়ে অনেক লেখাই হল। এবার চলুন মোটরসাইকেল নিয়ে কিছু জানা যাক। তাই এবারের আয়োজনে থাকছে আমাদেরে অতিপরিচিত এক মোটরসাইকেল ব্র্যান্ড সুজুকি। অনেকেরই পছন্দ বাইক/মোটরসাইকেল, আর সে তালিকায় পছন্দের ব্র্যান্ড হচ্ছে সুজুকি।

সুজুকি মোটর কর্পোরেশন একটি জাপানি মোটরসাইকেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, যাদের সদরদপ্তর জাপানের হামামাতসুতে অবস্থিত। শুধুমাত্র মোটরসাইকেল না তারা তৈরি করে বিভিন্ন রকমের ইঞ্জিন, গাড়ি এবং হুইলচেয়ার। ২০১৬ সালে পৃথিবীর সেরা ১১ টি অটোমোবাইল নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নাম ছিল সুজুকির। পৃথিবীর ২৩টি দেশে সুজুকির প্ল্যান্ট রয়েছে এবং ৪৫ হাজার কর্মকর্তা রয়েছে তাদের কোম্পানিতে। তাছাড়া ১৯২ টি দেশে তাদের ১৩৩ টি ডিস্ট্রিবিউটর রয়েছে। ১০৯ বছর বছর আগে ১৯০৯ সালে সুজুকির যাত্রা শুরু হয়। কোম্পানির প্রধান ছিলেন মিচিও সুজুকি। বর্তমানে কোম্পানির চেয়ারম্যানের পদে রয়েছেন ওসামা সুজুকি(২০০০ সাল থেকে)। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী তাদের আয়ের পরিমাণ ৮১৯ মিলিয়ন ডলার।

চলুন এবার তাহলে জানি সুজুকির কিছু অজানা তথ্য,

দুই ঘাতী ইঞ্জিনযুক্ত মোটরসাইকেল

‘সুকুকি জিটি৭৫০; source: thekneeslider.com’

১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৭০ সালের পূর্ব পর্যন্ত সুজুকির বাইকগুলো মূলত দুই ঘাতী ইঞ্জিনের ছিল। যার ফলে বাইকগুলো অনেক হালকা ছিল এবং আকারেও একটু ছোট ছিল। মেকানিক্যাল দিক থেকে এগুলোর সমস্যাগুলো কম ছিল এবং ভালোই সফলভাবে আউটপুট দিচ্ছিল। কিন্তু চাহিদার কথা ভেবে এবং আরো ভালো পারফরমেন্সের জন্যেই পরে চার ঘাতী ইঞ্জিনের আর্বিভাব ঘটে। সবথেকে বেশি প্রচলিত দুই ঘাতী মডেলটি ছিল সুজুকি সুজুকি জিটি৭৫০।

হায়াবুসা

‘হায়াবুসা মডেল; source: cdp.azureedge.net’

হায়াবুসা নাম শুনে ভয় বা অবাক হওয়ার কিছু নেই। অনেক বাইকপ্রেমীরা হয়তো এর নাম জেনেও থাকতে পারেন। এই হায়াবুসা হচ্ছে সুজুকির একটি বিখ্যাত বাইকের নাম। পৃথিবীর দুই চাকার বাইকের মধ্যে সবথেকে দ্রুতগতির জন্য এর বহুল পরিচিতি। যার সর্বোচ্চ গতিসীমা ৩০০ কি.মি./ঘণ্টা বা ১৮৬ মাইল/ঘন্টা। যাকে এক কথায় তুলনা করা যায় একটি ফাইটার প্লেনের গতির সাথে। আর এর ডিজাইনারের জন্যেও অনুপ্রেরণা হয়তো এই ফাইটার প্লেনই ছিল।

সুজুকি স্পোর্টসবাইক

‘জিএসএক্স-আর১০০০য়ারএ মডেল; source: www.chapmoto.com’

অনেকেই ভেবে থাকেন যে কোম্পানির সাধারণ বাইকের তুলনায় স্পোর্টস বাইকগুলোর বিক্রি কম হবে। কিন্তু এই ধারণাটি একেবারেই ভুল সুজুকির বেলায়। কোম্পানির ২৬ শতাংশ বিক্রির পরিমাণ যুক্ত হয় এই স্পোর্টস বাইক থেকেই। এর প্রধান ও মূল কারণ হচ্ছে কোম্পানির কর্মকর্তারা প্রতিনিয়তই বাইকে একের পর এক সংযোজন ও উন্নতিসাধন করে চলেছেন। যার ফলে একজন ক্রেতা একবার কেনার পরে সুজুকিতেই আকৃষ্ট হয়ে থাকেন এবং এর ফলে তিনি কেবল সুজুকির বাইকই কিনতে চান যা কিনা কোম্পানির বিক্রির উপর প্রভাব ফেলে।

দ্য কাটানা

‘কাটানা মডেল; source: http://www.motorcycledaily.com’

এবার পালা পরিচয় করিয়ে দেয়ার আরেকটি স্পোর্টস বাইকের সাথে, যার নাম কাটানা। যেকোনো একটি ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির জন্য একটি নতুন ডিজাইনের বাইক বাজারে নিয়ে আসাটা একটু কষ্ট্যসাধ্য ব্যাপার। যদিও তা সম্ভব করেছে সুজুকি। ১৯৮১ সালে সুজুকি নিয়ে আসে এই বাইকটি, যার ডিজাইনের দায়িত্বে ছিল জার্মানির একটি ডিজাইন টিম। বাজারে আসার পরে সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিল এই জিএসএক্স ১০০০এস কাটানা মডেলটিকে দেখে। কারণ শুধু ডিজাইন নয় এক দারুণ পারফরমেন্সেও দিয়েছে এটি। যার ফলে সেরা বাইকের খেতাব জিতে নিতে এর বেশিদিন সময় লাগে নি। আর তারপরে শুরু হয় বিক্রির ঝড় যা আজ অবধি চলে আসছে।

মালেশিয়ান জিপি

‘মালেশিয়ান জিপি মডেল; source: www.suzukimoto.my’

২০০০ সালের কথা, একইসাথে রেসিং এবং ম্যানুফ্যাকচারিং এর যুগ চলছে। আর ঠিক সেসময়ে কেন্নি রবার্টস জুনিয়র একইসাথে চারটি বিজয়ীর খেতাব জিতেছিলেন যার বাইকটি ছিল সুজুকির মালেশিয়ান জিপু মডেল। এরপরে জিপি৫০০ মডেলটি ব্যবহার করে তিনি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হন একই বছর। মি. জুনিয়র যখন পুরষ্কারগুলো জিতেছিলেন ঠিম সে সময়টি ছিল সুজুকির জন্য এক কষ্টসাধ্য সময় যা কিনা ১৯৯৩ সাল থেকে বহাল ছিল। কারণ ১৯৯৩-২০০০ সাল পর্যন্ত সুজুকির কোনো জয়ের রেকর্ড ছিল না যা ২০০০ সালে জিপি মডেলের বাইক ব্যবহার করে মি. জুনিয়র এনে দিয়েছিলেন। তাই সুজুকির ইতিহাসে এই বাইকটির অবদান অনস্বীকার্য।

২০০৮ সাল ও সুজুকি

‘সুজুকি বি কিং মডেল; source: www.cycleworld.com’

২০০১ সালের কথা, সুজুকির ডিজাইনাররা মনে মনে একটি বাইকের কথা চিন্তা করছিলেন যা পূর্ণতা পায় ২০০৮ সালে, যা নাম দেয় তার বি-কিং। এরপরেই একই বছর ২০০৮ সালে তারা বিশ্বের ইতিহাসে সর্বপ্রথম ফুয়েল ইনজেক্টেড মোটরক্রস বাইক বাজারে আনে। যার মডেল নাম্বার ছিল আরএম জেড-৫৪০। এরপরেই সুজুকি আবার তাদের স্ব অবস্থানে ফিরে আসতে সক্ষম হয় এবং ব্যবসায় উন্নতির জোয়ার বইতে শুরু করে। এরপরে যে মডেলগুলো এসেছিল সেগুলো হচ্ছে জিএসএক্স আর৬০০, জিএসএক্স আর৭৫০ এবং হায়াবুসা ১৩০০।

১ মিলিয়ন ইউনিট

‘জিএসএক্স আর১০০০ জেড; source: /pictures.topspeed.com’

১৯৮৫ সালের কথা, যাত্রা শুরু হয়েছিল জিএসএক্স-আর মডেলটির। আর ২০১২ সালে এসে ২৭ বছর পরে এই মডেলটির ১ মিলিয়ন ইউনিট বিক্রি পূর্ণ হয়েছিল।  এবং ঠিক একই বছর সুজুকি এই মডেলের আরেকটি বাইক বাজারে এনেছিল যা আগের থেকে অনেক বেশি তেল সাশ্রয়ী ছিল, অনেক বেশি আরামদায়ক ছিল এবং দারুণ পারফরমেন্স দিয়েছিল।

২০১৬ ও সুজুকি

‘সুজুকি জিএসএক্স আরআর; source: www.suzuki-motogp.com’

অনেক কোম্পানি থাকে যাদের ক্ষেত্রে এমনটা হয় যে বাজারে নতুন মডেল আনার সাথে সাথেই তাদের ব্যবসার অবনতি হচ্ছে কিন্তু সুজুকির বেলায় এটি প্রযোজ্য নয়। প্রতিটি নতুন মডেলই কোম্পানির ব্যবসা ক্ষেত্রে এক অনন্য মাত্রা যোগ করে ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। এবছরও সুজুকির ৯ টি মডেল বাজারে এসেছে এবং ম্যাভেরিক ভিনাইলস ব্রিটিশ গ্রান্ড প্রিক্সে জিএসএক্স আরআর মডেল নিয়ে মোটোজিপিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন।

রেসিং ইঞ্জিনিয়ার

‘জিএসএক্স আর১০০০; source: img.newatlas.com’

বলা হয়ে থাকে যে যেই কাজের জন্য ভালো তাকে সেটাই করতে দেয়া উচিত। সুজুকিও সেটাই করে থাকে। সুজুকির প্রধান ইঞ্জিনিয়ার যিনি রেসিং বিভাগের কাজ কর্ম তদারকি করে থাকেন তিনি পূর্বে একজন রেসের খেলোয়াড় ছিলেন, যার নাম সিনিচ্চি সাহারা। যিনি ডিজাইন করেছিলেন জিএসএক্স আর১০০০ মডেলটির। তিনি এমনই একজন ব্যক্তি ছিলেন যিনি খুব ধীরে ধীরে এবং খুব যত্নসহকারে ডিজাইনের কাজ করতেন এবং নিজের জানা সর্বোচ্চ জ্ঞানের প্রয়োগ ঘটাতেন।

জোয়েল রবার্ট

‘জোয়েল রবার্ট; source: upload.wikimedia.org’

১৯৭০ সালের কথা, সুজুকি অংশ নিয়েছিল ওয়ার্ল্ড মোটরক্রস প্রতিযোগিতায় এবং সৌভাগ্যবশত সেখানে চ্যাম্পিয়ন হয়। সেসময় সুজুকিই একমাত্র জাপানি কোম্পানি ছিল যারা এই প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছিল। আর এই সম্মাননাটি যার হাত ধরে এসেছিল তিনি হচ্ছেন জোয়েল রবার্ট। যিনি চালিয়েছিলেন ২৫০সিসির একটি সুজুকির বাইক। সেবছর আরো একটি প্রতিযোগিতায় ৫০০সিসির বাইক নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় সুজুকি, যেখানে বাইকার হিসেবে ছিলেন ব্যারি শীন ও রজার ডি কসটার।

এই ছিল সুজুকির কিছু অজানা কাহিনী ও তথ্য, আগামীতে থাকছে অন্য কোনো গাড়ি বা বাইক নির্মাতাদের অজানা কাহিনী ও তথ্য নিয়ে আয়োজন।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.