ভক্সওয়াগেন গাড়ির অজানা তথ্য

আজ এমন এক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কথা বলবো যার তত্ত্বাবধানে চলে আসছে বর্তমানের প্রায় অন্যান্য সকল গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। যার ছায়াতলে কাজ করছে অডি, পোর্শে, ল্যাম্বোরগিনি, রোলস-রয়েসের মতো গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো।

‘ভক্সওয়াগেন গাড়ি; source: www.volkswagen.co.uk’

কোম্পানিটির জন্ম হয় ১৯৩৭ সালের ২৮ মে, তৎকালীন অ্যাডলফ হিটলারের দ্বারা পরিচালিত জার্মান লেবার ফ্রন্টের সহযোগিতায় কোম্পানিটি যাত্রা শুরু করে। কোম্পানিটির নাম ভক্সওয়াগেন। তাদের সদর দপ্তর জার্মানির উলফবার্গে অবস্থিত। কোম্পানিটির চেয়ারম্যান বোর্ডের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত আছেন হারবার্ট ডিস। বর্তমানে এটি জার্মানির বৃহত্তম গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।

সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, ৬ হাজার ৭৩ মিলিয়ন ইউনিটের বেশি গাড়ি তৈরি করেছে কোম্পানিটি। আর আয় করেছে ৭৬.৭২৯ বিলিয়ন ইউরো, কোম্পানিটিতে কাজ করছে ১ লক্ষ ১৭ হাজার ৪০০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী।

চলুন জানি, ভক্সওয়াগেন গাড়ির অজানা কিছু তথ্য সম্পর্কে।

মানুষের গাড়ি ভক্সওয়াগেন

দ্য পিপলস কার কিংবা মানুষের গাড়ি বলা হয় ভক্সওয়াগেন গাড়িকে। ভক্সওয়াগেন জার্মান শব্দটির ইংরেজি অথবা বাংলা করলে এই অর্থটিই পাবেন আপনি।

‘প্রথম ভক্সওয়াগেন গাড়ি; source: symonsez.files.wordpress.com’

তাদের যাত্রার শুরু ১৯৩৩ সালে, জার্মানির বের্ন শহরে। সেখানে অ্যাডলফ হিটলারের সাথে মিটিঙে বসে ডাইমলার বেঞ্জ, জ্যাকব ভার্লিন ও ফার্দিনান্দ পোর্শের। সেখানে হিটলার দাবি রাখেন যে, এমন একটি গাড়ি বানিয়ে দিতে হবে যেটা খুব স্বল্পমূল্যের হবে, ছোট সাইজের হবে এবং কর্মক্ষম যেকোনো ব্যক্তিই সেটি কিনতে পারবে।

পরবর্তীতে এই প্রজেক্টটি হাতে পায় পোর্শে এবং তারা হিটলারের কথানুযায়ী একটি গাড়ি তৈরি করে। যেহেতু গাড়িটি মোটামুটি সবার ক্রয়সীমার মধ্যে ছিল তাই গাড়িটির নাম দেয়া হয়েছিল ভক্সওয়াগেন।

ফার্দিনান্দ পোর্শের দক্ষতা

গাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে মি. পোর্শের দক্ষতার প্রমাণ পাওয়াটা আসলেই যুক্তিযুক্ত এবং তিনি তা করে দেখিয়েছিলেন।

‘ভক্সওয়াগেন টাইপ ওয়ান; source: www.moma.org’

কাজ পাবার মাত্র দশ মাসের মধ্যেই তিনি হিটলারের কথানুযায়ী গাড়ির একটি প্রোটোটাইপ তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিলেন, যেটির নাম দেয়া হয়েছিল ভক্সওয়াগেন টাইপ ওয়ান।

ভক্সওয়াগেন বিটল

এমন একটা গাড়ির কথা যদি বলা হয় যা ভক্সওয়াগেনের ইতিহাসে দশকের পর দশক রাজত্ব করে গিয়েছে, বাজারে দারুণ সাড়া ফেলেছে, তবে সেটি হচ্ছে বিটল মডেল।

‘ভক্সওয়াগেন বিটল; source: www.scottsdaleastonmartin.com’

১৯৩৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত জার্মান অটোমেকার ভক্সওয়াগেন কর্তৃক এই গাড়ির মডেল ও গাড়িটি তৈরি করা হয়েছিল। অফিসিয়াল তথ্যমতে, ২ কোটি ১৫ লক্ষ ৪৯ হাজার ৪৬৪টি বিটল বাজারজাত করা হয়েছিল এবং ১৯৫৫ সালে গাড়িটির চাহিদা আরো বেড়ে গিয়েছিল। আনুমানিক ১৫০টি দেশে এই গাড়ি রপ্তানি করা হয়েছিল।

অ্যাওয়ার্ড ও ভক্সওয়াগেন গাড়ি

অ্যাওয়ার্ডের দিক থেকে কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই কোম্পানিটি, তা যত ছোট আকৃতির গাড়িই হোক না কেন।

‘ভক্সওয়াগেন গলফ; source: listers.co.uk’

গাড়িটি খুব নামকরা ও সম্মান সাপেক্ষ হয়ে ওঠে যখন এটি ১৯৯২ সালে ইউরোপিয়ান কার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিল। এরপর ২০১০ সালে ভক্সওয়াগেন গলফ মডেলটি ইউরোপিয়ান কার অফ দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিল। তারপর ২০১৩ সালে ভক্সওয়াগেন পোলো মডেলটি ইউরোপিয়ান কার অফ দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিল, ঠিক একই বছর ভক্সওয়াগেন গলফ মডেলটিও একই পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছিল।

‘ভক্সওয়াগেন পোলো; source: www.vler.in’

গাড়ি উৎপাদন বৃদ্ধি

ভক্সওয়াগেনের ক্ষেত্রে হয়তো হতাশা কিংবা ব্যর্থতার কোনো জায়গা নেই, তাদের ইতিহাস শুধুই সাফল্যগাঁথা নিয়ে রচিত।

‘এক মিলিয়ন গাড়ি তৈরির অনুষ্ঠান; source: http://blogmedia.dealerfire.com’

১৯৫০ সালে ভক্সওয়াগেন তৈরি করে এক লক্ষ গাড়ি। যা ১৯৫১ সালে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৫ লক্ষে। এবং ১৯৫৫ সালের ৫ আগষ্ট কোম্পানিটি একটি উৎসবের আয়োজন করে যেখানে কোম্পানিটির দশ লাখ গাড়ি তৈরির জন্য একে অন্যের সাথে দিনটি উদযাপন করেছিল।

অন্যান্য ক্ষেত্র

প্রতিটা গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কিছু না কিছু অন্য এবং আলাদা ধাঁচের ব্যবসা থেকে থাকে, ভক্সওয়াগেনের ক্ষেত্রেও এটির বিকল্প নেই।

‘ডিজেল মেরিন ইঞ্জিন; source: www.boatdesign.net’

জার্মান এই অটোমোবাইল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে বড় বড় মাপের ডিজেল মেরিন ইঞ্জিন, টার্বোচার্জার, গ্যাস ও স্টিম টার্বাইন, কম্প্রেসর ও কেমিক্যাল রিঅ্যাক্টর।

বর্তমান অবস্থা

বর্তমানেও ভক্সওয়াগেন কোম্পানির অবস্থা দারুণ, প্রতিনিয়তই নতুনত্বের সাথে এগিয়ে চলছে কোম্পানিটি।

‘ভক্সওয়াগেনের কারখানা; source: electrek.co’

বর্তমানে ২০ টি ইউরোপিয়ান দেশে, ১১ টি করে আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলোতে মোট ১১৯ টি ভক্সওয়াগেনের কারখানা রয়েছে। সেখানে প্রতিদিন মোট ৫ লক্ষ ৯২ হাজার ৫৮৬ জন কর্মকর্তা কাজ করে যাচ্ছে এবং গড়ে প্রায় ৪১ হাজার করে গাড়ি নির্মাণ করে চলছে। বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ১৫৩ টি দেশে তারা গাড়ি রপ্তানি করে থাকে।

মডেলের নাম ও প্রকৃতির সাথে মিল

প্রতিটা গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানেরই নিজ নিজ গাড়ির মডেলের নাম দেয়ার জন্য কিছু না কিছু উদ্দেশ্য কিংবা গোপন তথ্য থাকে। ভক্সওয়াগেনের ক্ষেত্রেও সেটি বিদ্যামান।

‘পাসাত মডেল; source: www.motortrend.ca’

তাদের প্রতিটি গাড়ির নাম প্রাকৃতিক কোনো উৎস যেমন: বাতাস, বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রের স্রোত ইত্যাদির সাথে সম্পর্কযুক্ত। যেমন: গলফ, স্কিরোক্কো, পাসাট, ভেন্টো, কোরাডো, জিট্টা ইতাদি। পাসাত নামটিও জার্মান ভাষার শব্দ, যার অর্থ দাঁড়ায় আয়ন বায়ু বা আয়ন বাতাস।

আমেরিকার বাজার ও বিটল মডেল

আমেরিকার বাজারের হোক কিংবা অন্য কোন দেশের বাজার, ভক্সওয়াগেনের জন্য এক সমৃদ্ধির নাম বিটল মডেল, যা কোম্পানিটিকে সাফল্যের শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিল।

‘বিটল মডেল; source: www.stevenscreektoyota.com’

গিনিস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম উঠেছিল এই ভিডব্লিউ বিটল মডেলটির। তাছাড়া আমেরিকার বাজারে প্রথম রপ্তানি করা গাড়ি ছিল জার্মানির অটোমোবাইল কোম্পানির নির্মিত এই বিটল মডেলটিই।

এই ছিল জার্মান গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভক্সওয়াগেনের কিছু অজানা তথ্য, আপনারও যদি এরকম কিছু তথ্য জানা থাকে ভক্সওয়াগেন গাড়ি নিয়ে তবে সেটিও জানাতেন পারেন কমেন্টে। আর সামনে থাকছে ভিন্ন কিছুর অজানা তথ্য নিয়ে আয়োজন!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.